Featured Posts

Tuesday, June 30, 2015

কেউ কেউ কবি নয়, সকলেই কবি

এই বইয়ের নাম দিয়েছি ‘কবিতা ক্লাস’। এতে চমকাবার কিছু নেই। অনেকে মনে করেন যে, কবিতা একটি অপার্থিব দিব্য বস্তু, এবং তাকে আয়ত্ব করবার জন্যে, মুনিঋষিদের মতো, নির্জন পাহাড়ে-পর্বতে কিংবা বনে-জঙ্গলে গিয়ে তপস্যা করতে হয়। আমি তা মনে করি না। আমার বিশ্বাস, জাতে যদিও আলাদা, তবু কবিতা-ও সাংসারিক বিষয় ছাড়া আর-কিছুই নয়, আমাদের এই সাংসারিক জীবনের মধ্যেই তার বিস্তর উপাদান ছড়িয়ে পড়ে আছে, এবং ইস্কুল খুলে, ক্লাস নিয়ে, রুটিনমাফিক আমরা যেভাবে ইতিহাস কি ধারাপাত কি অঙ্ক শেখাই, ঠিক তেমনি করেই কবিতা লেখার কায়দাগুলো শিখিয়া দেওয়া যায়। ‘কায়দা’ না-বলে অনেকে বলবেন ‘কলাকৌশল’, তা বলুন, কথাটা তার ফলে আর-একটু সম্ভ্রান্ত শোনাবে ঠিকই, কিন্তু মূল বক্তব্যের কোন ইতরবিশেষ হবে না। বিশ্বাস করুন চাই না-করুন, কবিতা লেখা সত্যিই খুব কঠিন কাণ্ড নয়।
সেই তুলনায় পদ্য লেখা আরও সহজ। শুধু কায়দাগুলো রপ্ত করা চাই, ঘাঁতঘোঁত জেনে নেওয়া চাই। কবিতা আর পদ্যের তফাত কোথায়, এক্ষুনি সেই তর্কে ঢুকে ব্যাপারটালে ঘোরালো করে তুলতে চাই না। তার চাইতে বরং জিজ্ঞেস করি, আপনার বয়স যখন অল্প ছিল, তখন ছোটপিসি কি ন-মাসি কি সেজদির বিয়ের সময়ে কি আপনার একখানা উপহার লিখবার ইচ্ছে হয়নি? হয়তো হয়েছিল। হয়তো ভেবেছিলেন, “বাঃ কী মজা, বাঃ কী মজা, খাব লুচি মন্ডা গজা” ইত্যাদি সব উপাদেয় খাবারদাবারের কথা দিয়ে লাইন-কয় লিখে তারপর “বিভুপদে এ-মিনতি—“ জানবেন যে, নবদম্পতি যেন চিরকাল সুখে থাকে।
কিন্তু হায়, শেষ পর্যন্ত আর হয়তো লেখা হয়নি। হবে কী করে? ‘মজা’র সঙ্গে ‘গজা’র মিলটাই তখন মনে পড়েনি যে। আর তাই, কড়িকাঠের দিকে ঘণ্টাখানেক তাকিয়ে থেকে, এবং নতুন-কেনা মেড-ইন-ব্যাভেরিয়া পেনসিলের গোড়াটাকে চিবিয়ে ছাতু করে, শেষপর্যন্ত হয়তো ‘ধুত্তোর’ বলে আপনি উঠে পড়েছিলেন। মনে-মনে খুব সম্ভব বলেছিলেন, “ওসব উপহার-টুপহার লেখার চাইতে বরং মুদির দোকানের খাতা লেখা অনেক সহজ।”
মুদির দোকানের প্রসঙ্গে একটা পুরোনো কথা মনে পড়ল। বছর পঞ্চাশেক আগেকার ঘটনা। আমার বয়স তখন বছর-দশেক। সেইসময়ে আঁক কষতে-কষতে শেলেটের উপরে আমি একটা পদ্য লিখেছিলুম। তার আরম্ভটা এইরকম—

আজ বড়ো আনন্দ হইয়াছে।
দেখিয়াছি, রান্নাঘরে কই আছে।

অর্থাৎ আমি বলতে চেয়েছিলুম যে, মা যখন কইমাছ রান্না করছেন, তখন দুপুরের ভোজনপর্বটা বেশ জমাট হবে, সুতরাং আজ আমার বড়োই আনন্দের দিন। আনন্দ অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হল না; এক জ্যাঠতুতো দাদা এসে চুলের মুঠি ধরে আমাকে শূন্যে তুলে ফেললেন, তারপর বাঁ হাতে আমাকে শূন্যে ঝুলিয়ে রেখে ডান হাতে একটা চড় কষালেন, তারপর বললেন, “হতচ্ছাড়া, তোমাকে আঁক কষতে দেওয়া হয়েছে, আর তুমি কিনা বসে-বসে কাব্যি করছ? এই আমি বলে রাখলুম, পরে তোমাকে মুদির দোকানের খাতা লিখে পেট চালাতে হবে।”
বাজে কথা। যে-ছেলে আঁক কষতে ভয় পায়, তার পক্ষে মুদির দোকানের খাতা লেখা সম্ভব নয়। চাল-ডাল-গোলমরিচ-জিরে-হলুদ-পাঁচফোড়নের হিসেব রাখা কি চাট্টিখানি ব্যাপার? সে-কাজ সকলে পারে না। তার জন্যে সাফ মাথা চাই। সেই তুলনায় বরং কবিতা লেখা অনেক সহজ। কবিতা লেখবার জন্যে, আর যা-কিছুরই দরকার থাক, মাথাটাকে সাফ রাখবার কোনও দরকার নেই। বরং, সত্যি বলতে কী, মাথার মধ্যে একটু গোলমাল থাকলেই ভালো। কিন্তু না, মাথার প্রসঙ্গ এইখানেই ছেদ টানা যাক, কেন-না বিশুদ্ধ আগমার্কা কবিরা হয়তো এইটুকু শুনেই চোখ রাঙাতে শুরু করেছেন, বাকিটুকু শুনলে তাঁরা আমাকে আস্ত রাখবেন না। তার চাইতে বরং যে-কথা বলছিলুম, তা-ই বলি।
আমার বলবার কথাটা এই যে, অল্প একটু চেষ্টা করলে যে-কেউ কবিতা লিখতে পারে। আমার মাসতুতো ভাইয়ের ছোটছেলেটির কথাই ধরুন। গুণধর ছেলে। টুললিফাই করেছে, পরীক্ষার হলে বোমা ফাটিয়েছে, গার্ডকে ‘জান খেয়ে নেব’ বলে শাসিয়েছে, উপরন্তু চাঁদা তুলে, মাইক বাজিয়ে সরস্বতী পুজো করে বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে তুষ্ট করেছে, তবু—এতরকম কাণ্ড করেও—স্কুল-ফাইনালের পাঁচিলটা সে টপকাতে পারেনি, তিন বার পরীক্ষা দিয়েছিল। তিন বারই ফেল। এখন সে আমাদের হাটবাজার করে দেয়, হরিণঘাটার ডিপো থেকে দুধ আনে, পঞ্চাশ রকমের ফাইফরমাশ খাটে, এখানে-ওখানে ভুল-ইংরেজিতে চাকরির দরখাস্ত পাঠায়, এবং—
এবং কবিতা লেখে। তা সে-ও যদি কবি হতে পারে, তবে আপনি পারবেন না কেন?
আমার গিন্নির খুড়তুতো ভাই এক সওদাগরি আপিসের বড়োবাবু। আগে সে-ও কবিতা লিখত, কিন্তু আপিসে তাই নিয়ে হাসাহাসি হওয়ায় এবং বড়োসাহেব তাকে একদিন চোখ পাকিয়া “হোয়াট্‌’স দিস্‌ আয়া’ম্‌ হিয়ারিং অ্যাবাউট ইউ” বলায়, কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে সে এখন গোয়েন্দা-গল্পের ভক্ত হয়েছে। তার কাছে সেদিন একটা ইংরেজি বই দেখলুম। বইয়ের নামে বুচার্‌ বেকার্‌ মার্ডার মেকার্‌। অর্থ অতি পরিষ্কার। যে-কেউ খুন করতে পারে। নৃশংস কসাইও পারে, আবার নিরীহ রুটিওয়ালাও পারে। খুন করবার জন্যে যে একটা আলাদা রকমের লোক হওয়া চাই, তা নয়।
তুলনাটা হয়তো একটু অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে, তবু বলি কবিতার ব্যাপারেও তা-ই। কবিতা লিখবার জন্যে আলাদা রকমের মানুষ হবার দরকার নেই। রামা শ্যামা যদু মধু প্রত্যেকেই (ইচ্ছে করলে এবং কায়দাগুলোকে একটু খেটেখুটে রপ্ত করে নিলে) ছন্দ ঠিক রেখে, লাইনের পর লাইন মিলিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে।
তা জন্যে, বলাই বাহুল্য, কিছু জিনিস চাই, এবং কিছু জিনিস চাই না।
আগে বলি কী কী চাই না—
১) কবি হবার জন্যে লম্বা-লম্বা চুল রাখবার দরকার নেই। ওটা হিপি হবার শর্ত হতে পারে, কিন্তু কবি হবার শর্ত নয়। পরীক্ষা করে দেখে গেছে, চুল খুব ছোটো করে ছেঁটেও কিংবা মাথা একেবারে ন্যাড়া করে ফেলেও কবিতা লেখা যায়। চুলের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে, কবিতার নেই।
২) সর্বক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাটির দিকে তাকিয়েও কবিতা লেখা যায়। সবচাইতে ভালো হয়, যদি অন্য কোনও দিকে না তাকিয়ে শুধু খাতার দিকে চোখ রাখেন।
৩) কখন চাঁদ উঠবে, কিংবা মলয় সমীর বইবে, তার প্রতীক্ষায় থাকবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অমাবস্যার রাত্রেও কবিতা লেখা যায়, এবং মলয় সমীরের বদলে ফ্যানের হাওয়ায় কবিতা লিখলে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না।
৪) ঢোলা-হাতা পাঞ্জাবি পরবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, স্যানডো গেঞ্জি গায়ে দিয়েও, কিংবা একেবারে আদুর গায়েও, কবিতা লেখা সম্ভব।
এইবার বলি, কবিতা লিখতে হলে কী কী চাই।
বিশেষ-কিছু চাই না। দরকার শুধু—
১) কিছু কাগজ (লাইন-টানা হলেও চলে, না-হলেও চলে)।
২) একটি কলম (যে-কোনও শস্তা কলম হলেও চলবে) অথবা একটি পেনসিল এবং–
৩) কিছু সময়।
কিন্তু এতসব কথা আমি বলছি কেন? কবিতার কৌশলগুলিকে সর্বজনের হাতের মুঠোয় এনে না-দিয়ে কি আমার তৃপ্তি নেই? সত্যিই নেই। ইংরেজিতে ‘পোয়্‌ট্রি ফর দি কমন ম্যান’ বলে একটা কথা আছে। আমার ইচ্ছে, কমন ম্যানদেরও আমি পোয়্‌ট বানিয়ে ছাড়ব। পরশুরামের কথা মনে পড়ছে। তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল, পৃথিবীকে একেবারে নিঃক্ষত্রিয় করে ছাড়বেন। কিন্ত, না-পারবার হেতুটা যা-ই হোক, কাজটা তিনি পারতে-পারতেও পারেননি। বিশ্বসংসারকে যাঁরা নিষ্কবি করে ছাড়তে চান (অনেকেই চান), তাঁরাও সম্ভবত শেষ পর্যন্ত পেরে উঠবেন না।
আমার প্রতিজ্ঞাটা অন্য রকমের। আমি ঠিক করেছি, বাংলা দেশে সব্বাইকে আমি কবি বানাব। দেখি পারি কি না।
কবিতা লিখবার জন্যে কী কী চাই, তা তো একটু আগেই বলেছি। চাই কাগজ, চাই কলম (কিংবা পেনসিল), চাই সময়। তা আশা করি কাগজ-কলম আপনারা জোগাড় করতে পেরেছেন। বাকি রইল সময়। তা-ও নিশ্চয়ই আপনাদের আছে। রেশনের দোকানে লাইন না-লাগিয়ে, এই যে আপনারা গুটিগুটি ‘কবিতার ক্লাস’-এ এসে হাজির হয়েছেন, এতেই বুঝতে পারছি যে, সময়ের বিশেষ অভাব আপনাদের নেই।
সুতরাং ‘দুর্গা দুর্গা’ বলে শুরু করা যাক। অয়মারম্ভঃ শুভায় ভবতু।
আগেই বলি, কবিতার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকা চাই। কাব্যগুণ, ছন্দ, মিল।
বিনা ডিমে যেমন ওমলেট হয় না, তেমনই কাব্যগুণ না থাকলে কবিতা হয় না। তার প্রমাণ হিসেবে আসুন, আমার সেই মাসতুতো ভাইয়ের ছোটোছেলের লেখা চারটে লাইন শোনাই:

সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে,
দুর্যোধনের ভাই।
গর্জনে তার তুর্য বাজে,
তর্জনে ভয় পাই।

 বলা বাহুল্য, এটা কবিতা হয়নি। তার কারণ, ছন্দ আর মিলের দিকটা ঠিকঠাক আছে বটে, কিন্তু কাব্যগুণ এখানে আদপেই নেই। এবং কাব্যগুণ না-থাকায় দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা নেহাতই বাক্যের ব্যায়াম হয়ে উঠেছে।
এবারে মিলের কথায় আসা যাক। মিল না-রেখে যে কবিতা লেখা যায় না, তা অবশ্য নয়, তবু যে আমি মিলের উপর এত জোর দিচ্ছি তার কারণ:
১) প্রথমেই যদি আপনি মিল-ছাড়া কবিতা লিখতে শুরু করেন, তাহলে অনেকেই সন্দেহ করবে যে, মিল-এ সুবিধে হয়নি বলেই আপনি অ-মিলের লাইনে এসেছেন। সেটা খুব অপমানের ব্যাপার।
২) মিল জিনিসটাকে প্রথম অবস্থায় বেশ ভালো করে দখল করা চাই। তবেই সেটাকে ছেড়ে দিয়েও পরে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব হবে। যেমন বড়ো-বড়ো লিখিয়েদের মধ্যে অনেকেই অনেকসময়ে ব্যাকরণের গণ্ডির বাইরে পা বাড়িয়ে চমৎকার লেখেন, এ-ও ঠিক তেমনই। ব্যাকরণ বস্তুটাকে প্রথমে বেশ ভালো করে মান্য করা চাই, তবেই পরে সেটাকে দরকারমতো অমান্য করা যায়। ঠিক তেমনি, পরে যাতে মিলের বেড়া ভাঙা সহজ হয়, তারই জন্যে প্রথম দিকে মিলটাকে বেশ আচ্ছা করে রপ্ত করতে হবে।
ছন্দ কিন্তু সবসময়ই চাই। আগেও চাই, পরেও চাই। আসলে আমার ক্লাসে আমি ছন্দের কথাই বলব। সেই বিচারে ‘কবিতার ক্লাস’ না-বলে একে ‘ছন্দের ক্লাস’ও বলা যেতে পারত। তাতে কিছু ক্ষতি ছিল না।

Thursday, June 11, 2015

আধুনিক বাঙলা কবিতা // মাহবুব মুহম্মদ

এক বাঙলা কবিতায় আধুনিকতা বিষয়টি কী তা নিয়ে অনেকদিন থেকে আলোচনা চলছে। সঙ্গে চলছে এর অন্তর্নিহিত ভাব কিংবা নির্যাস বের করার নানান চেষ্টা। যে দীর্ঘ কাল-পরিক্রমা নিয়ে আধুনিকতাকে নির্ণয় করতে হয়, বলতে গেলে সাহিত্যে সেই আধুনিকতা হঠাৎ করেই হাজির হয় নি। আর সাহিত্যের ধারাবাহিক গতি-প্রকৃতি একে বিস্তৃতি ঘটিয়েছে কবিতায়ও। ফরাসি বিপ্লব থেকে যে ইউরোপীয় আধুনিকতার জন্ম; সাহিত্যের প্রবাহিত ধারাবাহিকতায় সেটি প্রভাব বিস্তার করেছে ধীরগতিতেই। এর সঙ্গে কাজ করেছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ নানান পরিবর্তন। তবে বাঙলা সাহিত্যে আধুনিকতা নামক ধারণা’র হাওয়া লেগেছে অনেক পরে; ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। আর কবিতায় এসেছে আরও পরে, বলতে গেলে বিংশ শতকের তৃতীয় দশকে। কিন্তু বাঙালির আধুনিকতার রুদ্ধ ধারাটি মুক্ত করার প্রথম মানস-প্রতিভা ধারণ করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন সেই উনিশ শতকের মাঝামাঝিতেই। আর রবীন্দ্রনাথ এসে সে মুক্ত প্রতিভাকে দিয়েছিলেন তীব্র স্রোত। তবে মাইকেল কিংবা রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় সেই আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছিলেন ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের ক্ষুদ্র সীমানার মধ্যে। ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের ক্ষুদ্র বলয় থেকে বেরিয়ে বাঙলা কবিতা তখনও আধুনিকতাকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করেনি। আর তাই মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত কবিতা ছিল পরবর্তী তিরিশের দশক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শব্দগঠন, ভাষার শৈলী-বৈচিত্র্য, চিত্রকল্পের অনুভূতি প্রকাশের বিষয়ও ছিল আলাদা। বলতে গেলে মাইকেল থেকে রবীন্দ্র(রবীন্দ্রনাথের পুরো কাল নয়; ১৮৬১-১৯০০ খৃষ্টাব্দ) সময় পর্যন্ত বাঙলা সাহিত্যের জন্য ছিল আধুনিকতার প্রস্তুতিকাল। এই সময়েই আধুনিকতা প্রস্তুত হচ্ছিল তিরিশের জন্য। তিরিশের দশকের কবিদের হাতেই বাঙলা কবিতা ইউরোপীয় আধুনিকতাকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করে। এর পূর্বের কবিরা আধুনিকতাকে ধারণ করেছিলেন বিচ্ছিন্নভাবে। বিচিত্র প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমও ছিল প্রায় সম্পর্কশূন্য। কিন্তু তিরিশের দশকের কবিরাই প্রথম আধুনিকতাকে ব্যক্তির উপলব্ধির মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। কবিতায় গ্রহণ করেছিলেন সমগ্রতাকে। কোন এক নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তাদের ভাব-উপলব্ধি আবদ্ধ থাকেনি। সবকিছুকে ধারণ করেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কিন্তু প্রকাশ করেছিলেন নিজস্ব ভঙ্গিমায়। আর প্রত্যহ-জীবনের নানান উপলব্ধিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করারই ছিল বিংশ শতকের আধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে প্রকাশ-রীতির মধ্যেই যে আধুনিকতার বিকাশ ঘটেছিল পরিপূর্ণরূপে তা নয়, বরং এর অন্তনিহিত ভাবও ছিল কবির একান্ত নিজস্ব বিষয়। উদাহরণ তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকেই দেই- আমি সব দেবতারে ছেড়ে/ আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি/বলি আমি এই হৃদয়েরে;/সে কেন জলের মত ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়।......পৃথিবীর পথ ছেড়ে আকাশের নক্ষত্রের পথ/ চায় না সে?-করেছে শপথ/ দেখিবে সে মানুষের মুখ?/ দেখিবে সে মানুষীর মুখ?/দেখিবে সে শিশুদের মুখ?/চোখে কালোশিরার অসুখ/কানে যেই বধিরতা আছে? (বোধ; জীবনানন্দ দাশ) ব্যক্তি যে নিজের মধ্যেও স্বতন্ত্র, সেই পৃথক নিজস্ব ভাবনা ও সত্ত্বাকে খোঁজে বেড়ানোই হলো আধুনিকতা। আর এই আধুনিকতায় দেবতা থেকে যেন ব্যক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি। দুই প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগের সাহিত্যে বেদনাবিদ্ধ উপলব্ধির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটলেও চিত্রকল্প অনুভূতির প্রকাশ এতোটা জোরালো ছিল না যতোটা আধুনিক কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। বলতে গেলে, উপলব্ধিকে নিজস্ব ভঙ্গিমায় প্রকাশ বা চিত্রকল্পের অনুভূতিই আধুনিক কবিতাকে আলাদা করেছে প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের সীমারেখা থেকে। তবে মধ্য বা প্রাচীন সাহিত্যে চিত্রকল্পের অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার জোরালো প্রকাশ যে একেবারেই ঘটে নি মোটাভাবে তা বলা যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রকাশ পেয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে; অনেকটা আধুনিকতার মতো। তবে শৈল্পিকতার স্বতঃস্ফুর্ততা আর একজন কবি মনের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনার প্রকাশ কিন্তু এক নয়। দুটি ভিন্ন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এর অভিন্নতাও লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণ হিশেবে বৈষ্ণব পদাবলীর কথা বলা যেতে পারে। ধর্মকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগের এই পদাবলী রচিত হলেও ভাষার শৈলী-বৈচিত্র্য, অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশই এটাকে আধুনিকতায় নিয়ে গেছে। উদাহরণ দেই- সখি কেমনে ভুলিব হিয়া/ আমারই বধূআ আন বাড়ি যায়/ আমারই আঙিনা দিয়া। (বিদ্যাপতি) আধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য যদি হয়ে থাকে শৈল্পিক ভাবনা আর চিত্রকল্প অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, তবে বৈষ্ণব পদাবলীর অনেক পদেই আধুনিকতার প্রভাব লক্ষণীয়। কিন্তু মধ্যযুগের সাহিত্য বলেই কি কেবল পদাবলীকে আধুনিক হওয়া থেকে অস্বীকার করছি আমরা? অবশ্যই না! প্রথমেই বলেছি, আধুনিকতা কখনও কোন কিছুকে বিচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করে না। সমগ্রকে নিয়েই তার অবস্থান। বৈষ্ণব পদাবলীতে একদিকে যেমন প্রকাশ পেয়েছে জীবন-উপলব্ধির একচ্ছত্র ভাবনা-চিত্রের স্বতঃস্ফূর্ততা, অন্যদিকে পেয়েছে এর ধর্মীয় তত্ত্বকথা। অর্থাৎ বৈষ্ণব পদাবলীতে শৈল্পিকতার স্বতঃস্ফূর্ততা ঘটলেও কবির মানস-প্রকৃতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে ছিল ধর্ম-চেতনা। ধর্মকে উদ্দেশ্য করেই বৈষ্ণব পদাবলী রচিত। তাই বৈষ্ণব পদাবলীর আঙ্গিকগত দিক আধুনিক হলেও এর বিষয়বস্তু ছিল সম্পূর্ণ ধর্মাশ্রিত। তিন আধুনিক কবিতা বলতে অনেকেই গদ্যছন্দকে বুঝে থাকেন। আবার অনেকে মনে করেন, আধুনিকতা নামক নির্মম ধারা কবিতাকে তার মৌলিক আদর্শ থেকে অনেকটা দূরে নিয়ে গেছে। কিন্তু এ ধারণা অনেকাংশেই ঠিক নয়। আধুনিক কবিতা সময়ের ব্যবধানে আর সাহিত্যের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় একটি নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করে নিলেও তার মৌলিকতার বিচ্যুতি হয়েছে; এমন ধারণা মনে করার কোন কারণ নেই। বিশেষ করে, কবিতার অনুভূতি বা চিন্তাস্পর্শের কোন মৌলিকতাই আধুনিক কবিতার কোন মৌলিক বিষয়কে ম্লান করেনি। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক যুগের কবিতাই যেমন একটি ধারা সৃষ্টি করে নেয়, সে দৃষ্টি আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই বাঙলা কবিতা-সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্র সময় পর্যন্ত যে-কবিতা ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক; তিরিশের আধুনিক কবিদের হাতে এসে হয়ে গেল সেটি সম্পূর্ণ ব্যক্তি চিত্তের অনুভূতি প্রকাশ। যার ফলে আধুনিক কবিতা হয়ে উঠলো আধুনিক কবিদের ব্যক্তি উপলব্ধির লীলা-চৈতন্যের সহচর। তবে এটাও ঠিক যে আধুনিক কবিতা সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না, একটি নির্জন একান্ত উপলব্ধি-প্রতীক হয়ে ওঠে আধুনিক কবিতা। চার ব্যক্তি হৃদয়ের ভাবের দ্যোতনা, চিন্তা বা অন্তর-অনুভূতির কথাগুলো যখন একটি নির্দিষ্ট শৈল্পিকতার মধ্যদিয়ে প্রকাশিত হয় তখনই তা হয়ে ওঠে আধুনিক কবিতা। তবে বিশেষ করে, কবিতা বা গদ্য সাহিত্যের বেলায় আধুনিকতা বিষয়টি তার পূর্ববর্তী রচনার ওপর কিছুটা হলেও নির্ভর করে। এক্ষেত্রে, সাহিত্যের যে দীর্ঘ ইতিহাস কালের স্রোতে প্রবাহিত, সে বহমান ধারায় কবিতা কতটুকু আধুনিক তার একটি তুলনামূলক প্রশ্ন রয়েই যায়। তাই সময়ের ব্যবধানে আধুনিকতার বিষয়টি তার সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে। একে রুখা যায় না। সম্ভবও নয়। তার আপন ধারায় মধ্যদিয়ে সে প্রবাহিত হয়। একমাত্র আধুনিক কবিতায় একজন কবি পারেন তার মনের চিরচেনা সাধারণ কথাগুলোকে এক উচ্চমার্গীয় শৈল্পিক প্রতিভার দ্বারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ ঘটাতে। আর 'শৈল্পিকতার স্বতঃস্ফূর্ত' প্রকাশই আধুনিক কবিতাকে মধ্য বা প্রাচীন যুগের কবিতা থেকে করেছে ভিন্ন। যার ফলশ্রুতিতে ব্যক্তি তার ধারাবাহিক শিল্প-উপলব্ধি’র বিকাশ ঘটিয়েছে কবিতায়, বীজ বপন করেছে সংস্কৃতি মননের। তবে জ্ঞান,বুদ্ধি বা চিন্তার আশ্রয়ই কেবল শিল্পের প্রকাশ নয় বরং শিল্পের স্পর্শে এসেই জ্ঞানের স্ফুরণ আর বুদ্ধির তীক্ষ্ণ প্রকাশ ঘটেছে আধুনিক কবিতায়। এই উপলব্ধিবোধ থেকে হয়তো জীবনানন্দ দাশ বলেছেন-‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি।’ তাই কবি হৃদয়ের চিত্রকল্পের অভিজ্ঞতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশই ব্যক্তির কথাকে কবিতায় রূপান্তরিত করে। তবে কথা হলো- শিল্পের প্রকাশই কবিতা নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাব-অভিজ্ঞতা আর দৃশ্য কল্পনার এক অদৃশ্য ধারাবাহিক বন্ধন। এই বন্ধনের ক্ষমতা খুব অল্প সংখ্যক কবির মধ্যে বিরাজ করে যার ফলশ্রুতিতে তদের কবিতা হয়ে উঠে মহৎ। যদি এভাবে বলা যায়-একজন কবি যখন তাঁর পৃথিবীর সর্বময় অন্তর্নিহিত কথাকে -যা তিনি বুঝাতে চান তা- যখন একটি নির্দিষ্ট শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করেন তখনই তা কেবল কবিতা হয়ে ওঠে। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে- শিল্পের মূল্য যদি হয় ব্যক্তি-বিশেষের কাছে ভিন্ন, তবে শিল্প কি আপেক্ষিকতার পরিচয় দেয়? উত্তরে বলা যায়- আপেক্ষিকতার প্যাঁচে না জড়িয়ে শিল্পকে সর্বজনীনভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। তবে তার ব্যবহার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের মধ্যে ভিন্ন আবেদন আনতে পারে। সৃষ্টি করতে পারে আঙ্গিক বৈচিত্র্যের স্বতন্ত্র ধারাবাহিকতা। আর এ উপলব্ধিবোধ থেকে হয়তো কবিকে জ্ঞানস্রষ্টা না হলেও চলে, তবে তাকে শিল্পস্রষ্টা অবশ্যই হতে হয়। কেননা শিল্পের মধ্যে সবকে প্রকাশই হল একজন যথার্থ আধুনিক কবির কাজ।

কবিতায় চিত্রকল্প

ইমেজ বা চিত্রকল্প কবিতার অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ ও উপাদেয় উপাদান বটে, কিন্তু তা কোনো অর্থেই কবিতার বহিরঙের বিষয় নয়৷ ইমেজ হচ্ছে কবিতার অনত্মর্গত বিষয়ক, যা যুবতী নারীর বুকে বেড়ে ওঠা সত্মনযুগলের মতোই সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত৷ হেলাল আহমেদ

কবিতায় কবির উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতাকে কখনো সংহতি, কখনো ব্যপ্তি ও বৈচিত্র্য দানের প্রয়োজনেই চিত্রকল্পের জন্ম৷ এখানে মনে রাখা প্রয়োজন ‘চিত্রকল্প’ বিচ্ছিন্নভাবে কবিতা নয় বটে, কিন্তু কবিতার উপাদেয় উপকরণ৷ ইংরেজি ভাষার ‘ইমেজ’ এবং বাংলা ভাষার ‘বাক-প্রতিমা’ কথাটিও চিত্রকল্পের সমার্থক শব্দ৷ প্রকৃত অর্থে ‘চিত্রোপমা’ বলতে যা বোঝায় তা-ই হচ্ছে মূলত ইমেজ৷ এ ইমেজ হচ্ছে কবি আত্মার গূঢ় সঙ্কেতনির্ভর৷ ইমেজে থাকে ইন্দ্রীয়বেদ্য অনুভূতির প্রকাশ৷
তবে ইমেজ কেবল সাধারণ চিত্র বা ছবি নয়৷ ইমেজ হচ্ছে আমাদের ইন্দ্রীয় চেতনার দৃষ্টি, শ্রম্নতি, স্পর্শ, ঘ্রাণ, স্বাদ ইত্যাদির উদ্বোধক৷ ইমেজ এক ধরনের ‘চিত্রোপমা’ সম্ভবত এ কারণেই চিত্রোপমা প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘উপমাই কবিত্ব’৷ ইমেজ চিত্রোপমা বটে, কিন্তু ইমেজে অন্যান্য অলঙ্কারও পরস্পরিত হয়ে থাকে৷ স্মর্তব্য, রবীন্দ্রনাথের উপমার বিশেস্নষণ প্রসঙ্গে কবি সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর উক্তি : উপমা, উত্‍প্রেৰা, চিত্রকল্প এমনকি প্রতীকের সবগুলোই উপমার অভিজ্ঞানের মধ্যে ধরে নিতে হবে৷ শুধু ‘মতো’ থাকলেই উপমা হলো তা নয়, ভাব যেখানে ছবি হয়ে উঠেছে, চিনত্মা যেখানে স্পর্শসহ রূপ নিল, সেখানেই কোনো না কোনো, সূক্ষ্ম, চতুর, লুক্কায়িত উপায়ে উপমার ব্যবহার অনিবার্য৷ কবিতায় কবির শ্রবণগ্রাহ্য অভিজ্ঞতাকে ও বক্তব্যকে দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপদানের প্রয়োজনে চিত্রোপমা বা ইমেজের ব্যবহার অপরিহার্য৷ ইমেজের ফলেই কবিতার শ্রম্নতিগ্রাহ্য অনুভূতি গুচ্ছ ভিজু্যয়াল সামগ্রীর উপাদেয় উপকরণ হয়ে ওঠে৷ সে কারণেই বাংলা কাব্যে ইমেজের ব্যবহার এমন পৌনঃপুনিক৷ কয়েকটি দৃষ্টানত্ম :
হায়রে যেমতি/স্বর্ণচূড় শস্যৰত কৃষিদল বলে,/পড়ে ৰেত্রে, পড়িয়াছে রাৰসনিকর/রবিকুল রবি শূর রাঘবের শরে৷ (মেঘনাদবধ কাব্য, প্রথম সর্গ; মাইকেল মধুসূদন দত্ত)
বসিলা যুবতী/পদতলে, আহা মরি, সুবর্ণ দেউটি তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল৷
(ওই, চতুর্থ সর্গ, ওই)
ঘুমের মতো মেয়েগুলি/চোখের কাছে দুলি দুলি/বেড়ায় শুধু নূপুর রণরণি (মাতাল: ছবি ও গান; রবীন্দ্রনাথ)
কুহেলী গেল, আকাশে আলো দিল যে পরকাশি/ধূর্জটির মুখের পানে পার্বতীর হাসি৷ (সাগরিকা : মহুয়া, ওই)
বক্র শীর্ণ পথখানি দূর গ্রাম হতে/শস্যৰেত পার হয়ে নামিয়াছে স্রোতে৷ তৃষ্ণার্ত জিহ্বার মতো৷ (সুখ: চিত্রা; ওই)
সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা/অাঁধারে মলিন হলো, যেন খাপে ঢাকা বাঁকা তলোয়ার৷ (বলাকা : বলাকা; ওই)
হাওয়ার মুখে ছুটলো ভাঙা কুঁড়ের চাল/শিকল ছেঁড়া কয়েদী ডাকাতের মতো৷ (পৃথিবী: পত্রপুট, ওই)
অাঁচলখানি পড়েছে খসি পাশে/অাঁচলখানি পড়িবে বুঝি টুটি;/পত্রপুটে রয়েছে যেন ঢাকা/অনাঘ্রাতা পূজার ফুল দুটি৷ (নিদ্রিতা: সোনার তরী; ওই)
ছায়াখানি রক্তপদতলে/চু্যত বসনের মতো রহিল পড়িয়া;/অরণ্য রহিল সত্মব্ধ, বিস্ময়ে মরিয়া\\ (বিজয়িনী : চিত্রা; ওই)
নিকপিক করে ৰীণ কাঁকাল/পেশোয়াজ কাঁপে ঢালমাটাল/গুরম্ন উরম্নভাবে তণু নাকাল,/টলমল অাঁখি জল বোঝাই৷ (নওরোজ : জিঞ্জির, নজরম্নল) নজরম্নলের আরেকটি চিত্রকল্পে পাচ্ছি : ‘কোদালে মেঘের মউজ উঠেছে৷ আকাশের নীল গাঙে/ হাবুডুবু খায় তারা বুদ্বুদ্’৷
কি আশ্চর্য দীপাবলী জ্বেলেছো চারদিকে/বাহুমূলে চিবুকে গ্রীবায়/এমনকি ভ্রমরকৃষ্ণ খোঁপায় রেখেছো জ্বেলে/আলোর উত্‍সব৷/দু’চোখ নামালেই দেখি/বুকের দু’পাশে জ্বলে উজ্জ্বল আলোক সত্মম্ভ (ডুবে যাচ্ছি : প্রেমের কবিতা, আহসান হাবীব)
নীলপদ্ম যেমন করে দল মেলে/তেমনি করে তোমার চিঠির নীল খাম/ আমার হাতের মধ্যে খুলে গেল৷ (নীল খাম : ওই, ওই)
চৈতন্যের আলো পড়ে ঘুম-পাওয়া সত্তার পাপড়িত্বে/সূর্যের চুমোয় লাল পা-ুগাল৷ টেবিলের দু’টি/তরম্নণ কমলালেবু চেয়ে আছে দূরের আকাশে,/ চিকন সোনালি রম্নলি ম্রিয়মান শঙ্খ সাদা হাতে/যেন বেদনায় স্থির_ মনে হলো সেই দু’টি হাত৷ মায়াবী নদীর ভেজা সোনালি বালিতে আছে পড়ে৷ (তার শয্যার পাশে : প্রেমের কবিতা, শামসুর রাহমান)
দুর্লভ মনির মতো সত্মন/ ঘন হলো বাসনার তাপে, যেমন গ্রীষ্মের ফল/ গাঢ় হয় সূর্যের চুম্বনে৷ (সুন্দরের গাথা : প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃতু্যর আগে; ওই)
তোমার ভালোবাসায় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ যেমন নিঃঝুম দুপুরে৷ সুন্দরীর গায়ের কাছে বেড়াল : সমর্পিত, দ্বিধাহীন ও তৃপ্ত৷ (জাগরণ : যেহেতু জন্মান্ধ; আবু হেনা মোসত্মফা কামাল)
হলদ বলে না কথা, সে থাকে এ্যাম্বুশ করে চুপ/অতর্কিত ছুটে এসে পাতার শরীরে৷ নিজের স্বাৰর এঁকে যায়৷ (যুদ্ধ : কেউ কিছুই জানে না, অরম্নণাভ সরকার)
সন্ধ্যা স্নানসিক্ত তোমার চুল বেয়ে নেমে আসতো/পাতা বাহারের ঝোপের ওপর৷ (চোখের ভেতর অলিম্পন : বদ্ধমাতাল রোদে, জাহাঙ্গীর ফিরোজ)
একজনের দুই উরম্নর ফাঁকে মাংসল সঙ্গীন/অন্যের বিপরীত দেশে হরতন/ হরতনের বুকে সঙ্গীনের খোঁচা৷ সঙ্গীন থেকে বেরোল টোটা৷ টোটায় টোটায় পস্নাবিত হলো নদী/নদী হয়ে উঠলো নগ্ন নধর কানত্মি৷ ওম শানত্মি৷ ওম শানত্মি৷ ওম শানত্মি৷ (নগ্ন নধর কানত্মি আমরা তামাটে জাতি; মুহম্মদ নূরম্নল হুদা)
গহীন জঙ্গল থেকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা নাচের আদলে/ তোমার দেহের প্রতিটি ভাঁজ পাপড়ি মেলে দেয়৷ (রাত্রিবাস : বদ্ধ মাতাল রোদে, জাহাঙ্গীর ফিরোজ)
তুমি যে ল্যাবের ব্যাঙ/আলপিনে গাঁথা/ক্লোরোফরম মুখে নিয়ে বেদনা রহিত/অনিবার্য ঘুমে৷ (ধুলো : চিত্রল প্রতিবেদন, রনজু রাইম)
কবি রবীন্দ্রনাথ কবি জীবনানন্দ দাশের চিত্রকল্পসমৃদ্ধ কবিতা পাঠ করে তার ভেতর তাকিয়ে দেখার আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন৷ জীবনানন্দ দাশের কবিতা পূর্বাপর চিত্রকল্পসমৃদ্ধ৷ কয়েকটি দৃষ্টানত্ম:
হেমনত্মের মাঠে-মাঠে ঝরে/শুধু শিশিরের জল;/অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে৷ হিম হয়ে আসে/বাঁশপাতা_ মরা ঘাস_ আকাশের তারা;/বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা; (পেঁচা: ধূসর পা-ুলিপি) শ্যামার নরম গান শুনেছিল_ একদিন অমরায় গিয়ে/ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়/বাংলার নদী মাঠ ঘাসফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়৷ (বাংলার মুখ আমি : রূপসী বাংলা) চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,/মুখ তার শ্রাবসত্মীর কারম্নকার্য৷ (বনলতাসেন : বনলতা সেন) এই কথা বলেছিল তারে_/চাঁদ ডুবে চলে গেলে_ অদ্ভুত অাঁধারে/ যেন তার জানালার ধারে/উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিসত্মব্ধতা এসে৷ (আট বছর আগের একদিন : মহাপৃথিবী)
হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্টরোগী চেটে নেয় জল;/অথবা সে হাইড্র্যান্ট হয়তোবা গিয়েছিল ফেঁসে৷/এখন দুপুর রাত-নগরীতে দল বেঁধে নামে৷/ একটি মোটর কার, গাড়লের মতো গেল কেশে/অস্থির (পেট্রোল ঝেড়ে, (রাত্রি : সাতটি তারার তিমির)
ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলা,_/ডালিম ফুলের মত ঠোঁট যার, রাঙা আপেলের মতো লাল যার গাল,/চুল যার শাঙনের মেঘ, আর অাঁখি গোধূলীর মতো গোলাপী রঙিন৷ (ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল : ঝরা পালক)
ইমেজ বা চিত্রকল্প কবিতার অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ ও উপাদেয় উপাদান বটে, কিন্তু তা কোনো অর্থেই কবিতার বহিরঙের বিষয় নয়৷ ইমেজ হচ্ছে কবিতার অনত্মর্গত বিষয়ক, যা যুবতী নারীর বুকে বেড়ে ওঠা সত্মনযুগলের মতোই সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত৷

চিত্রকল্পের জানালায়ঃ সূচনা পর্ব // কে এম রাকিব

ভূমিকা পর্বের ভূমিকা :

যদি বলা হয় বকধার্মিক, তাহলে ভাষা সচেতন ব্যক্তির মনে কি সেই একপায়ে দাঁড়ানো বকটির ছবিই ভেসে ওঠে না? -যার ধ্যানী সুলভ মূর্তি, ভাবখানা এমন দুনিয়ার কিছুতেই আগ্রহ নাই, কিন্তু মওকা পেলেই যে ২-১টি মাছ ছো মেরে নিয়ে যাবে জলাশয় থেকে? কিংবা গড্ডলিকা প্রবাহ বলা মাত্র কি মনে পড়ে না গড্ডলের (ভেড়ার) সেই নির্বোধ অনুকরণ প্রবাহের দৃশ্য?
আমরা সংবেদী অঙ্গের (sensory organ) ব্যবহার করে বাগধারা কিংবা যেকোন শব্দবন্ধের অর্থ আরো সম্যক ভাবে উপলব্ধি করি। কারন তা আমাদের কল্পনাকে উসকে দেয়। তাই বকধার্মিক বলতে শুধু ভন্ডই বুঝি না, কিংবা গড্ডলিকা প্রবাহ বলতে অনেকের বিবেচনাহীন জোয়ারে গা ভাসানোই বুঝি না, আরো বেশি কিছু অনুভব করি।

এই যে শব্দের চিত্রধর্মিতার মাধম্যে অন্যের সাথে যোগাযোগ এটা আধুনিক কবিদের এক বড় হাতিয়ার। তাই চিত্রকল্প আধুনিক কবিতার এক অনিবার্য উপাদান। এ যুগে চিত্রকল্প ছাড়া কবিতা কল্পনা করাও কঠিন। সব কবিই এ যুগে চিত্রকল্প ব্যবহার করে থাকেন, কেউ সচেতনভাবে, কেউবা অসচেতনভাবে। কারন আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান বলছে, ভাষা যত আধুনিক হচ্ছে তত এর প্রতীকধর্মীতা ও চিত্রধর্মীতা বাড়ছে। তাই কবিতায় এর প্রভাব পড়বে বই কি! চিত্রকল্পের সাথে পরিচিত থাকাটা তাই জরুরী হয়ে পড়ে। ‘চিত্রকল্পের জানালায়’ লেখায় চিত্রকল্পের জানালা দিয়ে কবিতার আকাশে উঁকি দিতে চেষ্টা করা হবে। আশা করা যায়, ৪/৫ টি পর্বের মধ্যে আলোচনা শেষ করতে পারব। প্রথম পর্বে ভূমিকা থাকল। এর পর, কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার, চিত্রকল্পের বিবর্তন, মূর্ত, বিমূর্ত ও উত্তরাধুনিক চিত্রকল্প, চিত্রকল্পের মানসিক অভিঘাত, চিত্রকল্প ব্যবহারের কৌশল ও নানা দিক প্রভৃতি আলোচনার ইচ্ছা থাকল। ক্রমবর্ধমান পড়াশোনার চাপ ও নিজের কিংবদন্তি-পর্যায়ের আলস্যের কথা মনে রেখেও শুরু করলাম! দেখা যাক।

চিত্রকল্পঃ There are pictures in poems and poems in pictures [Chinese Proverb]

চিত্রকল্প শব্দটি বাংলায় সাধারণত Image এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাহিত্য সমালোচকদের কেউ কেউ image-এর অন্য বাংলা প্রতিশব্দ প্রস্তাব করেছেন, যেমনঃ সুশীলকুমার গুপ্ত ‘ভাবরূপচিত্র’ সত্যেন্দ্রনাথ রায় ‘মানস প্রতিবিম্ব’ অমলেন্দু বসু ‘বাকপ্রতিমার এছাড়া ‘বানী শিল্প’ ‘রূপকল্প’ ‘শব্দকল্প’ ইত্যাদি নামও পাওয়া গেছে। তবে চিত্রকল্প নামটিই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বেশি।

উইন্ডহ্যাম লুইস চিত্রকল্পকে কবিতার ‘Primary pigment‘ অর্থাৎ প্রাথমিক রঞ্জক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবার চিত্রকল্পকে কবিতার প্রাণ বলে অভিহিত করেছেন স্টিফেন জে. ব্রাউনঃ This must surely be obvious as regards poetry: imagery is its very life.

কবিরা খুবই সংবেদনশীল হয়ে থাকেন। কবির সংবেদনের গভীরে লুকিয়ে থাকে অভিজ্ঞতার নির্যাস ও সৃষ্টিশীল আকাঙ্ক্ষা। এই অভিজ্ঞতা যখন অসাধারণ শব্দচিত্রের মাধ্যমে কবিতায় বহুমাত্রিক বোধ উৎপন্ন করতে সক্ষম হয় তখনই তাকে চিত্রকল্প বলে অভিহিত করা যায়।
চিত্রকল্প নিয়ে আলোচনার আগে এর ইতিহাস আগে দেখে নেয়া যেতে পারে।

চিত্রকল্পের ধারনাঃ
চিত্রকল্পের ধারনাটি এসেছে আধুনিক সময়ে। প্রাচীন আলংকারিক ভাষার চিত্রধর্মিতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, বর্নাঢ্য চিত্রকল্পের জন্মও দিয়েছেন। কিন্তু তারা চিত্রকল্পের চরিত্র নিয়ে ভেবেছেন বা ব্যাপক নিরীক্ষা করেছেন বলে মনে হয় না। চিত্র সৃষ্টির প্রবণতা বহু প্রাচীন। প্রাচীন কবি বক্তব্যের বিষয়টিকে অলংকারপূর্ণ মাহাত্ম্যে পরিবেশন করার জন্য শব্দচিত্র সৃষ্টি করেছেন। একটি প্রাচীন কবিতায় আছেঃ

স্তন যুগমশ্রুস্নাত সমীপতরবর্ত্তি হৃদয়শোকাগ্নে।
চরতি বিমুক্তাহারাং ব্রতমিব ভবতো রিপুস্ত্রীনাম।।
অর্থাৎ হৃদয়ে যে শোকের আগুন জলছে তার খুব নিকটবর্তী ও হারবিমুক্ত এবং অশ্রু স্নাত স্তন যুগল যেন নিজের শত্রু-স্ত্রীদের বৈধব্য ব্রত পালন করছে।

প্রাচীন কবিতায় কাহিনীর প্রয়োজনে প্রচুর শব্দ চিত্র আকতে হয়েছে কবিদের। কিন্তু চিত্রকল্পকে কেন্দ্র করে প্রথম কাব্য-আন্দোলনের সূত্রপাত হয় পাশ্চাত্যে ১৯০৮ সালে। বিশ শতকের শুরুরর দিকে ইল্যান্ডে এজরা পাউন্ডের নেতৃত্বে আন্দোলন ঘটে তাকে সমালোচকেরা ইমেজিসম বা চিত্রকল্পবাদ বলে থাকেন। টি. ই হিউম ছিলেন পাউন্ডের প্রধান সহযোগী। এছাড়া উইন্ডহাম লুইস, এমি লোয়েল, হ্যারিয়েট মনরো এর সহ অনেকে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

ইমেজিস্ট কাব্য আন্দোলনের সাথে জড়িতরা কবিতার বিষয় ও আঙ্গিক সম্পর্কে নির্দিষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। সাহিত্যের একটি বিশ্বকোষ চিত্রকল্পের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এজরা পাউন্ডের বক্তব্য তুলে ধরেছেঃ
1. Direct treatment of the ‘thing’ whether subjective or objective
2. To use absolutely no word that does not contribute to the presentation
3. As regarding rhythm: to compose in the sequence of the musical phrase, not in the sequence of a metronome.
(ইশতেহার দিয়ে সাহিত্য বা কবিতা হয় কিনা,সে বিষয়ে বিতর্ক আছে। আমাদের আলোচনা যেহেতু, ইমেজ বা চিত্রকল্প কেন্দ্রিক তাই ইমেজিস্ট মুভমেন্ট সম্পর্কে উল্লেখ করা)
১৯১৩ সালের মার্চে এফ. এম. ফ্লিন্ট এবং এজরা পাউন্ড মার্কিন পত্রিকা ‘পোয়েট্রি’র পাতায় উপর্যুক্ত আন্দোলনের মূলনীতি প্রকাশ করেন। তারা কবিতায় বস্তুগত বা ভাবগত যেকোন বিষয়ে শব্দের প্রত্যক্ষ ও শব্দের সঠিক ব্যবহারের পক্ষপাতি ছিলেন।

ইমেজিস্টদের প্রতিনিধিত্বমূলক দুটি কবিতা দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রায়শই উল্লেখ করা হয়ঃ
A touch of cold in the autumn night
I walked abroad,
And saw the ruddy moon lean over a hedge
like a red faced farmer.
I didn’t not stop to speak, but nodded;
and round about were the wishful stars
with white faces like town children.
[T. E. Hulme, Autumn]
শীতের আলতো ছোঁয়া হেমন্তের রাতে
বাইরে হাঁটছিলাম আমি
দেখলাম টুকটুকে চাঁদ
লালমুখো চাষীর মতো,
আমি তাকে থামতে বলিনি কথা বলতে
তবে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলাম শুভরাত্রি
শহরের শিশুদের মত শুভ্র মুখ
চারদিকে তৃষ্ণার্ত নক্ষত্র।
(হুমায়ুন কবির-এর অনুবাদ অনুসরণে সরকার আমিনের অনুবাদ)

ইমেজিস্ট আন্দোলনের সদস্য এডোয়ার্ড স্টোরার কবিতাঃ

Forsaken Lovers,
Burning to a chase white moon,
Upon storage pyres of loneliness and drought.
পরিত্যক্ত প্রেমিকেরা
সহজ শুভ্র চাঁদের নিচে
একাকিত্ব ও শুষ্কতার আধার চিতার ওপর জ্বলছে।
(হুমায়ুন কবির-এর অনুবাদ অনুসরণে পোস্ট দাতার অনুবাদ)

উপর্যুক্ত দুটি কবিতাই ইমেজিস্টদের মানসিকতাকে প্রকাশ করে। আরো প্রকাশ করে চিত্রকল্পের অনেক বৈশিষ্ট্য যেমনঃ কবিতায় শব্দে আঁকা চিত্রমাত্রই চিত্রকল্প নয়। ‘চিত্রশিল্প যেমন শুধু চোখকে তৃপ্ত করে না, উদ্বুদ্ধ করে কল্পনাকেও, জন্ম দেয় তৃতীয় মাত্রার- চিত্রকল্পও তেমনি তৃতীয় মাত্রার জনয়িতা’ তার মানে চিত্রকল্পের চিত্রাতীত নান্দনিকতা ও চিত্রাতীত বাস্তবতা থাকে। সেনসিবিলিটি, সময় চেতনা, চিন্তার নরম আলো থাকে উৎকৃষ্ট চিত্রকল্পের মধ্যে।

চিত্রকল্প ও প্রতীকঃ
চিত্রকল্প ও প্রতীকের মধ্য মিল থাকলেও এরা আলাদা। যে কোন শব্দই সংকেতের কাজ করে। প্রতীকের করে, আরো ফোকাসড হয়ে। কিন্তু প্রতীকের মধ্যে গতিশীলতা নাই, যা আবার চিত্রকল্পের প্রাণ। এছাড়া চিত্রকল্পের উদ্বুদ্ধকরণ শক্তি অনেক বেশি। চিত্রকল্পের সাংকেতিক ক্ষমতাও বেশি কেননা এর রয়েছে দৃশ্য নির্মাণের প্রশস্ত ভূমি।
চিত্রকল্প আলাদা কোন অলংকার নয়ঃ
অনেকে চিত্রকল্পকে আলাদা একটি অলংকার বিবেচনা করলেও চিত্রকল্প আলাদা কোন অলংকার নয়। বরং এটি একাধিক অলংকারের নির্যাস। চিত্রকল্পে থাকতে পারে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক ইত্যাদি অর্থালংকার থাকতে পারে থাকতে পারে যেকোন শব্দালংকারও। তবে কবিদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় একটি সাদৃশ্য মূলক অলংকার উপমা, কারন এই অলংকারের রয়েছে চিত্রময়তা ও অন্তর্গত ভাবকে মূর্ত করার অনুপম ক্ষমতা। তাই চিত্রকল্পকেও উপমার ব্যবহার বেশি।

চিত্রকল্পকে সবসময় দৃশ্যমান হতে হবে এমন কোন কথা নেইঃ
দৃশ্যমানতা চিত্রকল্পের সবচেয়ে বড় গুন হলেও চিত্রকল্পকে সবসময় প্রকটভাবে দৃশ্যমান হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু চোখ নয়, কান, জিভ ও স্পর্শ ইন্দ্রিয় ও অনুপ্রেরণা পারে জাগাতে। এমনকি মানুষের বিশ্বাস ও যাপন থেকেও অস্পষ্ট, বিমূর্ত অবয়ব কিন্তু যা বোধ ও চেতনাকে স্পর্শ করে যায় এমন চিত্রকল্প সৃষ্টি হতে পারে। এমন কি একই সাথে একাধিক সংবেদী অঙ্গকে ছুঁয়ে যেতে পারে কবির বোধ। (ইংরেজিতে একে বলে Synesthesia, বাংলায় কি বলে জানি না, জানলে জানান প্লিজ) যখন কেউ বলে, তোমার ‘গলাটা ভারী শোনায়’ কিংবা কারো ‘শীতলকণ্ঠ’ এর কথা বলে তখন কিন্তু একাধিক সংবেদী অঙ্গের অনুভূতিই আমরা পাই। এমিলি ডিকিনসনের’ ‘Light laughs the breeze in her castle of sunshine’ লাইনটি অথবা এডিথ সিটওয়েলের ‘dull blunt wooden stalactite / Of rain creaks, hardened by the light. পড়লে আমরা টের পাই সিনেস্থিসিয়ার ব্যবহার। জীবনানন্দ যখন চিলের ‘ডানার রৌদ্রের গন্ধ’ মুছে ফেলার কথা শোনান, কিংবা বলেন, ‘…নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার’ কিংবা ‘ধূসর চালের গন্ধে তরঙ্গেরা ঝরেছে দুবেলা’ তখনও একই ভাবে সিনেস্থিসিয়ার ব্যবহার উপলব্ধি হয়।

এটা ঠিক যে শুধুমাত্র চিত্রকল্প তৈরির উৎকর্ষই কবিতাকে উৎকৃষ্ট কবিতা বানায় না কিন্তু বেশির ভাগ আধুনিক কবিতায় চিত্রকল্পের নৈপুণ্য দেখা যায় কোন না কোন ভাবে। কবিতার অন্যান্য উপাদানের সাথে
চিত্রকল্পের ব্যবহার তাই গুরুত্ব বহন করে।

কবিতাকে মনে করি শিল্পের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। কবিতা কী? কবিতা কাকে বলে ? এখন আর এসব প্রশ্ন ভাবার অর্থ আছে বলে মনে হয় না। তবে কবিতায় নিজের কৌতূহলের কারনে কবিতার যাবতীয় উপাদান, কাজকারবার, পাঠকের মানসিক অভিঘাত, ছন্দ ও অলঙ্কারের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে পড়তে, জানতে, শিখতে, বুঝে নিতে আগ্রহী। ব্লগে এ আলোচনার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, যা বুঝতে চেয়েছি শুধু তা শেয়ার করা, বরং ধারনা গুলোকে যাচাই করে নেয়া, সহ ব্লগারদের থেকে নতুন কিছু জানা.

তথ্যসূত্রঃ
The world of imagery ,Stephen J. Brown
The poetic image, C. Day Lewis
বাংলাদেশের কবিতায় চিত্রকল্প, বাংলা একাডেমী প্রকাশিত।
The struggle of the modern, Stephen Spender
Discovering poetry, Elizabeth Drew
নির্বাচিত প্রবন্ধ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ।

[এই তথ্যসূত্র খুব একটা ভ্যালিড না, কারন লেখার সময় দু'একটা ক্ষেত্র ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্মৃতি থেকে টুকটাক তথ্য নেয়া হয়েছে, বিভিন্ন উৎস ঠিক ঠাক মনে থাকার কথা না। তবে বইগুলো প্রাসঙ্গিক এবং ভাল বই সেই হিসেবে নাম করা যায়]

ক্যানভাসে উন্মীলিত নিঃশব্দ কবিতার চিত্রকল্প

কবিতা ও ছবির মধ্যে একটা সমান্তরাল সম্পর্ক আছে। সম-অন্তরাল বা সমান দূরত্ব বজায় রেখেই দুজনের চলা। তাতে তাদের মিলে যাওয়ার বা এক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কখনও তৈরি হয় না। কিন্তু একের আলো বা একের অভিজ্ঞান প্রতিনিয়তই অন্যকে ছুঁয়ে যেতে চায়। এরকম তুলনাও দিয়েছেন অনেক প্রাজ্ঞজন। যে ছবি হল অনুচ্চার কবিতা, আর কবিতা হল উচ্চারিত ছবি। একের প্রতি অন্যের আকর্ষণ প্রবল। কিন্তু দুজনকেই নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যের পরিসর বজায় রেখে অন্যের সারাৎসার আত্মস্থ করতে হয়। কবিতা নিয়ে যখন কেউ ছবি করতে চান, তখন কবিতার সত্তাকে প্রসারিত করার দায় থাকে তাঁর। কবিরও দায় থাকে ছবির আপাত স্থির প্রতিমাকল্পকে উন্মীলিত করার।

সুমনা ঘোষের সপ্তম একক প্রদর্শনী চলছে অ্যাকাডেমিতে। প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত ২৫-টি ছবির মধ্যে বেশ কিছু ছবি তিনি করেছেন কবিতা অবলম্বন করে। কবিতার সচিত্রকরণ বা ইলাস্ট্রেশন তিনি করেন নি। কবিতার অন্তর্নিহিত বীজ থেকে পল্লবিত করে তুলতে চেষ্টা করেছেন ছবির নিজস্ব অবয়ব ও সম্পৃক্ত প্রাণ। কবিতার ছন্দিত সুষমা তাঁর ছবিতে উন্মীলিত করেছে কল্পরূপের বিভিন্ন আবহ। বাস্তবের ভিত্তি থেকেই জেগেছে সেই কল্পরূপ। আপাত-বাস্তবকে দ্রবীভূত করে সেই কল্পরূপ ব্যঞ্জিত করেছে জীবনের বা অনুভবের বিভিন্ন মাত্রা।

একজন অনামী কবিতা লেখকের একটি কবিতা-সংকলন থেকে কয়েকটি কবিতা বেছে নিয়েছেন শিল্পী। সংকলনটির নাম ‘রাত্রির শূন্যের প্রান্তে।’। আঁধার অনেক সময়ই সৃজনের গর্ভগৃহ। তার ভিতর যখন পার্থিব বা অপার্থিব আলোড়নে শূন্যতা সঞ্চারিত হয়, তখন সৃজনের মূল কেন্দ্রটিই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। সেই সংকটকেই নানাভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন তিনি। সেই প্রয়াসে ঝলসে উঠেছে নানাবিধ আলো। আবার আঁধারে তা আবিলও হয়ে গেছে। আলো-আঁধারের দ্বান্দ্বিকতা থেকেই গড়ে উঠেছে তাঁর ছবি। কবিতা সংকলনটির নামের সাযুজ্যে এই চিত্রমালার শিরোনাম দিয়েছেন শিল্পী: ‘অন দ্য এজ অব নকটারনাল ভয়েড’।

সংকলনের একটি কবিতার শিরোনাম ‘গন্ধ’-এর অনুসরণে যে ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী, তার নাম দিয়েছেন ‘গন্ধই চেনায়’। গন্ধ একটি বিমূর্ত অনুষঙ্গ। কবিতায় গন্ধের কথা বলা যায়। কিন্তু ছবিতে তাকে রূপায়িত করা যায় না। এটা ছবির একটা সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্র। তাই শিল্পীকে যা করতে হয়, তা হল এই বিমূর্ত বোধকে দৃশ্য-রূপে রূপান্তরিত করে নেওয়া। সুমনা তাঁর ছবিতে এটাই করেছেন। কবিতায় বলা হয়েছে গল্পই মানুষকে চেনায় প্রকৃতি থেকে ঈশ্বর পর্যন্ত সমস্ত অভিজ্ঞান। তার পরেও অমোঘ এক শূন্যতা পরিব্যাপ্ত করে তাঁর চেতনাকে। কবিতার ভাষায়—‘তবু মধ্যরাতে জেগে উঠে দেখি/ তিমিরের গর্ভের ভিতর এক বিপন্ন শূন্যতা দোল খাচ্ছে হাওয়ায় হাওয়ায়।’ শিল্পী চিত্রপটকে দুই ভাগে বিভাজিত করেছেন। এক পাশে দিনের রৌদ্রাভা, অন্য পাশে রাতের তিমির। আলোতে অবস্থান করছে একটি পাখি। আঁধারে ভাসমান এক মানবী। মধ্যভাগে গন্ধলীন কুসুমিত এক বৃক্ষের তলায় নির্জনে দাঁড়িয়ে আছে একাকী মানুষ। বুকের কাছে তাঁর বিপন্ন শূন্যতা, আঁধারলীন বৃত্তের প্রতীকে রূপায়িত। দোলনেরও প্রতীক ধরা আছে মানুষটির হাতে। দৃশ্য-প্রতীক নির্মাণের স্বাধীনতা শিল্পীর একান্ত নিজস্ব। কবিতার বিমূর্ততাকে এভাবেই দৃশ্যপ্রতীকে রূপায়িত করে এর নিহিত ভাবকে প্রসারিত করেছেন শিল্পী।

আর একটি কবিতার প্রথম দুটি লাইনে বলা হয়েছে: ‘সপ্তপর্ণী বৃক্ষমূলে রেখে দাও বাসনা তোমার / হেমন্তে সুবাস এসে জাগাবে কামনা’। এখানে ‘বাসনা’-কে শিল্পী রূপায়িত করেছেন পাখির ডিমের প্রতীকে, ‘সপ্তপর্ণী বৃক্ষমূলে যার অবস্থান। আর ‘কামনা’ ব্যাঘ্ররূপী এক নারীতে রূপান্তরিত হয়ে হেঁটে যাচ্ছে আঁধারের দিকে। যেখানে রয়েছে ভোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি। মানবীর হাতে এক মানবের মুখ, যা তাঁকে ‘স্বপ্নিল’ করে রেখেছে ‘শান্তিনিকেতন’-এর অভীপ্সায়। এভাবেই বাকপ্রতিমাকে চিত্রপ্রতীকে রূপান্তরিত করে বিভিন্ন ছবিতে শিল্পী তাঁর নিজস্ব বোধের নানা স্তরকে ব্যঞ্জিত করেছেন। এই একই প্রদর্শনী এর পরে অনুষ্ঠিত হবে সোদপুরের জলসাঘর গ্যালারিতে।

কাব্যসংসারে কবির দায়, পাঠকের দায়িত্ব // ফকির ইলিয়াস

কবি তো শিক্ষক নন, যে ক্লাস করাবেন। তিনি লিখবেন তার ভাষায়। ভাষা শেখানোর দায়িত্ব তো কবি নিতে পারেন না। অনেক ভালো, মেধাবী, সৃজনশীল কবি আছেন। এরা নতুন। যারা খুবই ভালো লিখেন। কিন্তু সেগুলো কজন পড়েন? শুধু একটু বাহবা দিয়েই দায়িত্ব শেষ? না, তা বোধহয় নয়। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ এগুলোকেও প্রথম প্রথম অনেকে কবিতা বলেননি। বলেছেন এগুলোতো গদ্য। এখন সে মানসিকতা অনেকের বদলেছে। আরো বদলাবে, সন্দেহ নেই। পথে হাঁটতে হলে পথ চিনতে হবে। কবিতার আলোই টেনে নিয়ে যাবে পথচারীকে। পাঠকের অবশ্যই অধিকার আছে, তিনি কী পড়বেন- কী পড়বেন না। মানুষের জীবন খুব ছোট। তাই পছন্দ করে পড়া অবশ্যই জরুরি। যারা অবিন্যস্ত লেখেন, এরা অটোম্যাটিকেলি বাদ পড়ে যাবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা নিয়ে ভাবারও কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কবিতা মানেই কয়েকটা শব্দের সংযুক্তিই নয়। কবিতা চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাসসহ বিনির্মাণের সমন্বয়।


একটি কাব্যসংসারের অংশীদার দুজন। কবি ও পাঠক কিংবা পাঠিকা। কবি বাগান সাজান। পাঠক তা ভোগ করেন। এই যে দান এবং গ্রহণের আনন্দ, তা-ই একটি কবিতাকে মহিমান্বিত করে তোলে বারবার। কালের পর কাল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ধরা যাক কবি জীবনানন্দ দাশের কথা। জীবনানন্দ দাশ তাঁর জীবদ্দশায় ততোটা আলোচিত হতে পারেননি, যা পরে হয়েছেন। তাঁর ‘কবিতার কথা’ আমি যে কোনো নবিস কবিতানুরাগীকে পড়তে বিনীত অনুরোধ করি।
আধুনিক কবিতা সমকালীনতার, প্রাঞ্জল বুনন। প্রকৃতি যেমন ছিল তেমনি আছে। একজন নতুন কবিকে নিজের চিত্রকল্প এঁকে যেতেই হয়। দায় কিন্তু পাঠকেরও আছে। ছন্দ সমিল কবিতা খুঁজে অতীতে ফেরার চেষ্টা না করে পাঠককে ভাবতে হবে, একবিংশ শতাব্দীতে লেখা হচ্ছে ‘দৃশ্য কবিতা’।
সিলিকন ভ্যালির আলোয় বসে যে কবি নির্মাণের নৃতত্ত্ব আঁকছেন, তার পঙ্ক্তিমালায় তিরিশের চিত্রকল্প, উপমা, অনুপ্রাস খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে। এ কথা খুবই সত্য, যদি সবাই কবি হতে পারতেন, তবে সব ভাষাসাহিত্যের সকল অধ্যাপকরাই হতেন বড় বড় কবি। তারাই হতেন সব কবিতার নিয়ন্ত্রক। কিন্তু তা কোনোকালেই হয়নি।
আমার দেখে হাসি পায়, যারা শুদ্ধ করে বাংলা লিখতে পারেন না তারাও কবিতা লিখেন। কাগজে পাঠান। খাতির থাকলে ছাপাও হয়। আমার কথা হচ্ছে যারা এই শূন্য দশকেও প্রকৃত কবিতাগুলো লিখছেন, তারা তো বাংলা শব্দই ব্যবহার করছেন। তাহলে পাঠক-পাঠিকারা না বুঝার কৈফিয়ত তুলবেন কেন? ব্যর্থতাটা কার? দুর্বোধ্য বলে কবিতায় কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।
যিনি পড়ছেন, তার পঠন-পাঠনের গভীরতা কতোটুকু আছে, তাও বিবেচনায় রাখা জর"রি। এক সময় জীবনানন্দ দুর্বোধ্য ছিলেন। এখন বহুল নন্দিত। হয়তো অবহেলা ছিল, তাঁর প্রতি। সমকালীন পাঠক তা খণ্ডন করে এগিয়ে গেছেন আরেক ধাপ।


দুই.


একটি কবিতাকে কে কিভাবে বিশ্লেষণ করেন, তাও বিবেচ্য বিষয়। কবি যে মনন নিয়ে লিখেছেন, পাঠক সে চোখ দিয়ে নাও দেখতে পারেন। এই কবিতাটি পড়া যাক ........।
‘নারীর ভিতরে ডুবে পুরুষটির মৃত্যু হয়েছিল। বালির উপর ছড়িয়ে আছে/
তার চশমা, বই ও ব্রিফকেস। সে নেই কিন্তু একটা পড়ে-থাকা শূন্য কাঁচের/
বোতলে তার আবছা প্রতিবিম্ব আটকে আছে। সেই প্রতিবিম্ব এখনো হাসছে,/
হাত নাড়ছে, কথা বলছে, মাঝে-মধ্যে রুমালে মুছে নিচ্ছে চুম্বনসিক্ত ঠোঁট।/
আর, অসংখ্য ডুবুরি সেই বোতলের ভিতরে ঢুকে খুঁজে চলেছে তাঁর মৃতদেহ’
(মদ/রণজিৎ দাশ/শ্রেষ্ঠ কবিতা)
কবিতাটির চিত্রকল্প কি খুব কঠিন? কারো কাছে তা লাগতেই পারে। তারপরও এটি একটি সার্থক কবিতা। আসুন, আরেকটি কবিতা পড়ি ।
‘তোমরা চলে যাচ্ছ, ট্রাকে মালামাল উঠে গেছে সব, এক জীবনে মানুষের কতবার যে
বাড়ি বদল জরুরি হতে পারে মানুষও বুঝি তা জানে না
একদিন এভাবেই ট্রাকে মাল বোঝাই করে রেলিং ঘেরা এই বাড়ির
একতলায় তোমরা নোঙর ফেলেছিলে, অতিথি পাখি ও গৃহস্থ বিড়াল একদিন
ভোরবেলা চার সদস্যের একটি নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার দেখে আহ্লাদে উল্লাস করেছিল
তোমরা ত্যাগ করে যাচ্ছ একটি অভ্যস্ত পরিমণ্ডল, তার বিয়োগ ব্যথায়
তুমি কাঁদলে তোমার মা কাঁদল, ট্রাকের সিটে গিয়ে বসলে সবাই, তুমি,
তোমার মা, ছোট ভাই, কুমারী আত্মীয়া, বাবাকে তো আগেই রেখে এসেছ অনিবার্য মাটির বিছানে
গাড়ি স্টার্ট নিতেই তাড়াতাড়ি হাত নাড়লে তোমরা সবাই, শেষবার তাকালে,
বাড়িওয়ালা অনুভূতিহীন, তখনই টাঙিয়ে দিচ্ছেন ভাড়াটে ধরার ‘টু লেট’ বাহানা,
ঘরে জল ঢেলে ধুয়েমুছে দেওয়া হচ্ছে তোমাদের সুদীর্ঘ ছোঁয়া
সব মায়া কাটিয়ে বাধ্য হয়ে তোমরা শহরান্তরে যাচ্ছ,
পেছনে কাজলা বিড়ালটি দৌড়াচ্ছে.. দৌড়াচ্ছে.....দৌ...ড়া....চ্ছে’
(বিড়ালটি/মুজিব মেহদী)
কতো মর্মস্পর্শী এই কবিতাটির বুনন।


তিন.


বাংলাদেশে/কলকাতায় একটা কবিতার বই ছাপা হয় (সবার নয় অবশ্য) ৫০০/১০০০।
এমনকি পাশ্চাত্যেও কাব্যগ্রন্থের কাটতি কম কেন? এ সময়ের আলোচিত মার্কিনি কবি ইউসেফ কমুনিয়াকার ‘টকিং ডার্টি টু দ্য গডস’ পড়নু। দেখবেন কবিতার বিবর্তন কিভাবে ঘটিয়েছেন তিনি। সময়কে ধারণ করতেই হবে।
আমি নিশ্চিত, ১০০ বছর পর আরো বদলাবে কবিতার বুনন। তা কেউ আটকাতে পারবে না। পারা সম্ভবও নয়।
না, কবিতা ব্রহ্মবাদ নয়। সবাই স্পর্শ করুক, তা সব কবিই চান। কিন্তু স্পর্শ করার মননও তো থাকতে হবে।
কবি তো শিক্ষক নন, যে ক্লাস করাবেন। তিনি লিখবেন তার ভাষায়। ভাষা শেখানোর দায়িত্ব তো কবি নিতে পারেন না। অনেক ভালো, মেধাবী, সৃজনশীল কবি আছেন। এরা নতুন। যারা খুবই ভালো লিখেন। কিন্তু সেগুলো কজন পড়েন?
শুধু একটু বাহবা দিয়েই দায়িত্ব শেষ? না, তা বোধহয় নয়। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা' এগুলোকেও প্রথম প্রথম অনেকে কবিতা বলেননি। বলেছেন এগুলোতো গদ্য। এখন সে মানসিকতা অনেকের বদলেছে। আরো বদলাবে, সন্দেহ নেই।
পথে হাঁটতে হলে পথ চিনতে হবে। কবিতার আলোই টেনে নিয়ে যাবে পথচারীকে। পাঠকের অবশ্যই অধিকার আছে, তিনি কী পড়বেন- কী পড়বেন না। মানুষের জীবন খুব ছোট। তাই পছন্দ করে পড়া অবশ্যই জরুরি।
যারা অবিন্যস্ত লেখেন, এরা অটোম্যাটিকেলি বাদ পড়ে যাবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা নিয়ে ভাবারও কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কবিতা মানেই কয়েকটা শব্দের সংযুক্তিই নয়। কবিতা চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাসসহ বিনির্মাণের সমন্বয়।
না, কবি নিজে পড়ার জন্য লিখেন না। লিখেন সবার জন্য। তবে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তিনি নিতে পারেন না। বেছে বেছে পড়লে পাঠকের মনন সময়ই সমৃদ্ধ করে। আবারো বলি, যারা আধুনিক, উত্তরাধুনিক, মৌলাধুনিক কবিতার রসাস্বাদন করতে চান তারা কলকাতার শক্তি, সুনীল, জয় থেকে আজকের বিকাশ সরকার, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাংলাদেশের আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, মোহাম্মদ রফিক থেকে আজকের আবু হাসান শাহরিয়ার পর্যন্ত পড়ে দেখতে পারেন।
চলমান বাংলা সাহিত্যে অনেক ভালো কাজ হচ্ছে কবিতায়। পড়তে হবেঃ পড়তে হবেঃ এবং পড়তে হবে। পড়ার কোনো বিকল্প নেই। পঠন-পাঠনই বাড়িয়ে দিতে পারে কাব্যসংসারের প্রগাঢ় প্রেম।
 

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় চিত্রকল্প

জীবনের উপলব্ধি ইন্দ্রিয়জ। কবি-শিল্পীরা তাঁদের সাহিত্যকর্মে ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা প্রকাশে নানামুখী তত্ত্বের অবতারণা ঘটিয়েছেন। শিল্পকর্ম বিনির্মাণে গড়ে তুলেছেন নানা ফর্ম। এ তত্ত্বের আধুনিক ধারাটি হচ্ছে ‘চিত্রকল্প’। সাহিত্যকে বলা হচ্ছে, ‘সামগ্রিক জ্ঞান, অনুভূতি ও চৈতন্য যা হয়ে ওঠে পঞ্চেন্দ্রিয়ের কাছে অর্থময়, আবেগবাহী ও ব্যঞ্জনাধর্মী’-এ অর্থে, পাঠকের ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিতে গিয়ে শিল্পস্রষ্টাকে তার কল্পনাশক্তির ওপর জোর দিতে হয়। কবির মৌলিক শক্তিও ‘কল্পনাশক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত। যে কবির কল্পনাশক্তি যত প্রখর, সে কবির কবিতাও তত বেশি শক্তিশালী। কবি জীবনানন্দ দাশও ‘কল্পনাশক্তি’র ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আব্দুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা বুদ্ধি নয়, হৃদয় নয়-কল্পনা। কবিতা এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এ জন্যই যে কল্পনা তার পিছনে সবচেয়ে প্রধানভাবে সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে কাজ করে যায়।’ কবিতায় কল্পনাশক্তির প্রয়োগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ‘চিত্রকল্প’ অভিধাটি। কবিতার চিত্রকল্প দৃশ্যগত ও ইন্দ্রিয়গম্য হিসেবে পাঠকের উপলব্ধিতে আসে। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় এ দুই ধরনের চিত্রকল্পেরই সন্ধান মেলে। চিত্রকল্পের ধারণাটি প্রাচীন হলেও বাংলা সাহিত্যে ত্রিশ কালপর্বে খ্যাত পঞ্চকবির হাতে চিত্রকল্পের সার্থক উপস্থিতি লক্ষণীয়। এরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চাশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ কবিদের অন্তর্মূল ধরে নাড়া দিয়েছিল কবিতার শরীরে সংহতি-ভাবনা। ফলে এই সময়পর্বের কবিরা কবিতা শরীরে প্রতিমা স্থাপনের কৌশল গ্রহণ করেন। চিত্রকল্প নির্মাণের জন্য ব্যক্তিগত উপলব্ধির প্রয়োগ ঘটান কবিতার শরীরে। যে কারণে এই সময়পর্বের কবিতায় চিত্রকল্পের নকশায় একটি সুচিন্তিত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। শব্দের প্রতীকী তাৎপর্য ও নাটকীয়তায় কবিতায় চিত্রকল্পগুলো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এ ধারায় সৈয়দ শামসুল হককে অগ্রবর্তী হিসেবে শনাক্ত করা যায়। সৈয়দ হকের কবিতার বিষয়-প্রকরণ যেমন বহুমাত্রিক অনুভাবনা জারিত তেমনি আবহমান বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যঋদ্ধ। কবিতায় প্রেম, স্মৃতিকাতরতা, অবচেতন মনের আশা-আকাক্সক্ষা প্রকাশে তিনি সমসাময়িক কবিদের চেয়ে ব্যতিক্রম মনোভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। কবিতায় সমকালীন মৌল প্রবণতাগুলো তুলে ধরতে কবিতাকে চিত্রকল্পের অবয়বে বিনির্মাণ করেছেন।
‘এখনও পরায় মনে পরাগের মতো রাত নেমে এলে বাংলার প্রান্তরে
সেই দূর কবেকার মেয়েদের দীর্ঘ কালো চুল
পাখির চিৎকার শুনে এখনও তো করে উঠি ভুলÑ
বুঝি সেই! সেই তারা! এখনও মেলার দিনে ডাকে যেন কেউ
আমারই এ ভুলে যাওয়া ডাকনাম ধরে।’
‘তবু বেঁচে থাকা অপরূপ’ কবিতায় কবিকে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত মনে হলেও ভাবনাটি একটি সুস্পষ্ট গ্রাম্য দৃশ্যের ভেতর পাঠককে টেনে নিতে সক্ষম। তিনি ঘন ও জটিল জীবনের রূপায়ণ তুলে ধরেছেন এ কবিতায়।
‘আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় কেন,
ক্যান এত তপ্ত কথা, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিরাম ধ্যান।
.... মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবশ্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।’
গল্পের পটভূমে রচিত ‘পরানের গহীন ভিতর’ কবিতাটি আবেগনির্ভর হলেও সুসংহত। এ কবিতায় জীবনের ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা ও বাসনার তীব্রতা লক্ষণীয়, যা পোড় খাওয়া সম্পর্কের ইতিবৃত্তকে ইন্দ্রিয়গম্য করে তোলে। সহজ ও সুনির্মিত দৃশ্যকল্পের কারণে কবিতাটি পাঠ মাত্রই পাঠকের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় এবং চৈতন্যলোকে ঠাঁই করে নেয়। কিংবাÑ ‘আমার কি আছে? গ্যাছে সুক/য্যান- কেউ নিয়া গ্যাছে গাভীনের বাঁটে যতটুক দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহন দিয়া।’ সৈয়দ শামসুল হক অন্তস্থ স্বরে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠে কবিতায় চিত্রকল্প এঁকেছেন। এ কবিতার মধ্য দিয়ে গোটা বাংলাদেশই চিত্রিত হয়ে ওঠে পাঠক হৃদয়ে। যেখানে নকল আভিজাত্যের কোনো প্রলেপ নেই।
ইংরেজী সাহিত্যে চড়বঃরপ রসধমব বা চিত্রকল্প নিয়ে নানা মত পরিলক্ষিত হলেও এজরা পাউন্ডের ‘অহ রসধমব রং ঃযধঃ যিরপয ঢ়ৎবংবহঃং ধহ রহঃবষষবপঃঁধষ ধহফ বসড়ঃরড়হধষ পড়সঢ়ষবী রহ ধহ রহংঃধহঃ ড়ভ ঃরসব’ উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য। বলা যায়, সময় এবং পরিসরের খণ্ড ধারণা থেকে অভিজ্ঞতার মুক্তিই যথার্থ চিত্রকল্পের স্বরূপ। সৈয়দ শামসুল হকও সময়ের প্রেক্ষিত জীবনের আবেগঘন ভগ্নাংশগুলো তুলে ধরেছেন কবিতায়Ñ
‘বাংলার নদীতে সেই বিদ্যাপতি মহাজন বিখ্যাত ভাদরে
জলের তুমুল চুমো একদিন মনে মনে
কামরাঙা সে কার অধরে!
আমিই সে আমি বুঝি ভাদর বাদলে ভেজা মেয়েটির মুখ
করতলে তুলে নিই, রাখি ঠোঁটÑওতেই যা হয়েছিলো সুখÑ
এখনো ভুলিনি সেই দস্যিপনা প্লাবিত সবুজে!’
‘বাংলার নদীতে সেই’ কবিতাটিতে ‘জলের তুমুল চুমো’ কিংবা ‘ভাদর বাদলে ভেজা মেয়েটির মুখ’ চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি চিরচেনা আবহমান বাংলার প্রতিকৃতি অঙ্কন করেছেন। কবি সৈয়দ হক প্রকৃতি সত্তার অংশ হিসেবে প্রকৃতির অন্তর্গত ছল, রস ও জরার কাব্যিক রূপান্তর করেছেন যা চিত্ররূপের সঘন অবয়বে পাঠক হৃদয়ে ভেসে ওঠে। ব্যক্তিগত আবেগ ও চিন্তার সুষম বিন্যাস তার কবিতায় বহুমাত্রিক বোধ উৎপন্ন করে।
‘আমাদের এক নয়, অনেক জীবন।
মাঝে মাঝে মনে হয় সংখ্যা নয়, সংখ্যার বিভ্রমÑ
তবে একটিই জীবন! বিপরীত বিরুদ্ধ কি নয় তারা?’
‘হে অমর আগুনপাখি’ শিরোনামের দীর্ঘ কবিতায় তিনি জীবনকে সংখ্যাতত্ত্বে ফেলে নানাভাবে বিশ্লেষণ করে জীবনের মানে খুঁজেছেন। কখনো প্রকৃতির দ্বারস্থ হয়েছেন। লন্ডনের পাতাল ট্রেনের হইসেলের মধ্যে ঘোরলাগা দৃশ্যপটে কবি প্রিয় মাতৃভাষার অপেক্ষা করেছেন। আবার, এ কবিতায়Ñ
‘কত কাল কাটিয়েছি কত স্বৈরশাসকের বুটের তলায়,
চাবুকের প্রহারে প্রহারে আমি কুঁকড়ে গেছি, পউষের শীতেও কি আমি
রৌদ্রের প্রার্থনা নিয়ে দাঁড়াইনি জানাজার মতো মাঠ ব্যাপ্ত হাহাকারে?’
কবিতায় ‘স্বৈরশাসকের বুটের তলায়’ উল্লেখ করে তিনি স্বাধীন ভূ-খ-ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের চিত্রকল্প এঁকেছেন। একাধিক স্বৈরশাসকের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া কবি জীবনের ব্যক্তিক জীবনের ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির কথা ব্যক্ত করেছেন। সময়ের বৈচিত্র্য ও কালের ব্যাপ্তিতে যাপিত জীবনে তিনি জেনেছেন অনেক কিছু। বাঙালী জাতির মঙ্গলভাষ্য রচনা করতে চেয়েছেন ‘কারবালা’ ও ‘কুরুক্ষেত্র’ ইত্যাদি মিথিক শব্দসমবায়ে। কবিতাটির শেষে ‘আগুনপাখি’ নিজেই পুরাণে পরিণত হয়। মানব জাতির অগ্রযাত্রায় ভষ্ম থেকে জন্ম নেয়া এই আগুনপাখিকে তিনি জাতির মুক্তি-দূত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যা কবির দেশপ্রেমের এক অমল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ এ কবিতা পাঠে পাঠক তার নিজের জীবনের বর্তমান, ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্র-সমাজ, প্রকৃতি-পরিবেশ সম্পর্কিত চিন্তার আবর্তে ক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। এ কবিতাটিতে কখনো দৃশ্যকল্প আবার কখনো ইন্দ্রিয়জ চিত্রকল্পে সঘন বলা যায়।
‘সাহিত্য হল সমাজ-অন্তর্গত মানুষের চেতনালোকের চিত্রকল্পের অন্তর্গূঢ় শৈল্পিক প্রতিফলন’Ñ এই আলোকে শিল্প সৃষ্টির মূলাধারে প্রতিদিনের খ- খ- ঘটনা, কর্মকা-, ক্লেশভোগ, সহিষ্ণুতা, অভিজ্ঞতা নানাভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। যা একজন কবি বিমূর্তাভায় কবিতায় প্রকাশ করেন। চিত্রকল্প যাকে পরিপূর্ণতা দেয়। কবি তাঁর অভিজ্ঞতা জারিত অনুচিন্তনের সঙ্গে সমকালীন পটভূমি প্রকৃতি জগৎ, ব্যক্তিক যন্ত্রণা বা মনোবেদনা, অবক্ষয়, বিকৃতি, স্বপ্ন ও অবচেতন স্তরের গহনে ডুব দিয়ে বিচিত্র বিষয় আহরণ করে গড়ে তুলেছেন কবিতার বাক্সময় বিশ্ব। যার হাতে সমকাল, ইতিহাস আর আধুনিকতা, পরস্পর হাত ধরাধরি করে কবিতার ক্ষেত্রকে করেছে উর্বর। হাজার বছরের বাংলা কবিতার ভিত্তিভূমে দাঁড়িয়ে কাহ্নুপা, বিদ্যাপতি, বড়–চন্ডিদাস হয়ে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ দাশের সহযাত্রী হয়ে বাংলা কবিতাকে মাধুর্যম-িত করে তুলেছেন সৈয়দ শামসুল হক। নিপুণ চিত্রকর্মে বাংলার মুখ এঁকেছেন আর নিবিড় মমতায় লালন করেছেন হাজার বছরের বাংলার ঐতিহ্য। সৈয়দ শামসুল হক চিত্রকল্পের উৎস হিসেবে নানামাত্রিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, উপমা, অলংকার, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি শিল্পভাবনার দারস্থ হয়েছেন। ভাষা প্রয়োগ দক্ষতায় এসব শিল্পশ্লিষ্ট উপকরণ দিয়ে ইন্দ্রিয়গম্য চিত্রকল্প বিনির্মাণ করেছেন।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় চিত্রকল্প // মো হা ম্ম দ নূ রু ল হ ক

জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতার স্বতন্ত্র বিভা। ঔজ্জ্বল্য ও লাবণ্যে অনন্য। শব্দগঠন, প্রয়োগ এবং বাক্যগঠনে স্বতন্ত্র। অনন্য কবিতার শরীর সৃজনে। তার ‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোত্স্নার প্রান্তরে’ দেখে কবি নিজেও প্রস্তর যুগ থেকে আধুনিক যুগের দিকে যাত্রা করেছিলেন। অথচ এ চিত্রকল্পের ভেতরই শাশ্বত হয়ে উঠেছিল ‘নিওলিথ-স্তব্ধতার জ্যোত্স্নাকে ছুঁয়ে’ যাওয়া অশেষ যুগের বাস্তবতা। ‘ঘোড়া’ কবিতার চিত্রকল্পগুলো কালচেতনায় উদ্ভাসিত বলে কবি সমকালের হয়েও মহাকালের বাণীবাহক হয়ে উঠেছিলেন। আর ‘আকাশলীনা’ কবিতায় স্বার্থপর প্রেমিকের আকর্ষণ থেকে কোনো এক ‘সুরঞ্জনা’কে ফেরানোর তাগিদে যে সময়ের ছবি আঁকলেন, তা-ও ‘নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে’র।
‘আকাশলীনা’ কবিতায় যে কবিকে পাই, সে কবি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বাধীন রুচির প্রতি প্রতিবন্ধক—যা আধুনিকসম্পন্ন মানুষের দীক্ষিত মন গ্রহণ করতে চায় না। কিন্তু ভিন্নার্থে চিন্তা করলে বিষয়টি ভিন্ন রকমের তাত্পর্যও বহন করে। ‘সুরঞ্জনা’ যদি সাধারণ কোনো এক সরলার ভূমিকায় কল্পনা করা যায়—যার সারল্যভরা মনে কোনো প্রবঞ্চনা ধরা পড়ে না, সে সরলার যে কোনো ভুল পথে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে মুক্ত করার ব্রত নিজে গ্রহণ করেছেন। ‘গোধূলী সন্ধির নৃত্য’ আপাতজীবিকাজটিল জীবনের অভিজ্ঞান। এ কবিতারও চতুর্থ পঙিক্ততে ‘হেমন্তের বিকেলের সূর্য গোল—রাঙ্গা’ হয়ে ওঠার পর পরই একটি স্পেসসহ পঞ্চম পঙিক্ততে ‘চুপ-চুপে ডুবে যায়—জ্যোত্স্নায়’ ভিন্ন রকম স্বাদ এনে দেয়।
কল্পনাবিলাসিতার জন্য কল্পনাবিলাসীদের বারণ করতে পারেন না। তবু যারা ‘টের পায় কামানের স্থবির গর্জনে/বিনষ্ট হতেছে সাংহাই’ তারা নিশ্চয় মেনে নেবেন, জীবনানন্দ দাশকে কোনোভাবেই রাজনীতিবিমুখ কবি বলা যায় না। জীবনানন্দ দাশ নির্জনতাপ্রিয় কবি সত্য; কিন্তু বিশ্বচরাচরের বিভিন্ন ঘটনা ও দুর্ঘটনা তাকে ভাবিত করেনি—এ কথা সত্য নয়। অন্তর্মুখীন হওয়ার কারণে উচ্চকণ্ঠে চেঁচামেচিতে তার অনীহা ছিল ‘রূপার ডিমের মতো চাঁদের বিখ্যাত মুখ দেখা’র মতো। দূর থেকে দেখেছেন যা কিছু পৃথিবীতে অকল্যাণ ডেকে আনে। যুদ্ধের ভয়াবহতা দূর থেকে অনুভব করেছেন, প্রতিকারের কোনো ব্যর্থতম চেষ্টা করেননি; কিন্তু রাজনীতিবিদ, সমাজবিদদের প্রেরণা জুগিয়েছেন তীব্র প্রতিবাদের। সময়ের অগ্রগামী ছিলেন বলে তাত্ক্ষণিক তার কাব্যভাষা সমকালের যুগমানস উপলব্ধি করতে পারেনি। এ ‘গোধূলী সন্ধির নৃত্য’ একটি খণ্ড কবিতা হয়েও হয়ে উঠেছে সমকালের যুগসন্ধিক্ষণের যোগসূত্র।
আবেগের তারল্যে ভেসে গেলে এ কবিতটিও ‘বনলতা সেন’-এর মতো পাঠকপ্রিয় হতে পারত। কিন্তু ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি যে অর্থে ইতিহাস-আশ্রিত ভৌগোলিক সীমা ও অসীমের সঞ্চয়, সে অর্থে ‘গোধূলী সন্ধির নৃত্য’কে অভিব্যঞ্জিত করা যায় না। দু’টি কবিতার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, অনুভব ভিন্ন। ভিন্ন দু’টি কবিতার অবয়ব ও কালচেতনাও। তাছাড়া অ্যাডগার অ্যালান পো’র ঞড় ঐবষবহ কিংবা ইয়েটস-এর উত্বধস-যবধাু খধহফ কবিতার সঙ্গে ‘বনলতা সেন’ কবিতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকায় ‘বনলতা সেন’ কবিতায় কেবল স্থানিক পরিচয় কিংবা নায়িকার বঙ্গীয়করণের পরও বাঙালি পাঠক হিসেবে মনে খুঁত থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু ‘গোধূলী সন্ধির নৃত্য’ কবিতায় এ ঋণপরিগ্রহণের যোগসূত্র না থাকার পরও কিছুটা জটিল আবর্তনের স্মারক হওয়ায় আবেগী পাঠক-সমালোচক মনে বিস্ময়বোধ জাগাতে পারেনি। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় উল্লিখিত কবিতা দু’টির যতই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হোক না কেন, চিত্রকল্প নির্মাণে ‘বনলতা সেন’ স্বতন্ত্র। উল্লিখিত কবিতা দু’টিতে এমন চিত্রকল্প ঝলসে উঠতে দেখা যায় না। ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’-এর মতো উপমা-আশ্রিত এমন অমোঘ চিত্রকল্প উল্লিখিত কবিতা দু’টিতে কোথায়? কোথায় এমন ভারমুক্ত আশ্রয়? ‘পাখির নীড়ের’ সঙ্গে তুলনীয় আশ্রয় কেবল নাতিশীতোষ্ণ বাংলায়ই সম্ভব। আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ডে কল্পনারও অতীত। তাই ‘বনলতা সেন’ কবিতার সঙ্গে যতই অ্যাডগার অ্যালান পো’র ঞড় ঐবষবহ কিংবা ইয়েটসের উত্বধস-যবধাু খধহফ কবিতার মিল থাকুক, ‘বনলতা সেন’ স্বতন্ত্র শিল্পই।
জীবনানন্দ স্বভাবের সপক্ষে একটি জটিল সারল্যের কবিতা ‘বোধ’। সহজ-সরল বাক্যবন্ধের সম্মিলনে রচিত এ কবিতা। আপাত সরল বাক্যাবলির মাধ্যমেই জটিল চিন্তা ঘনীভূত হয়ে উঠেছে; ধীরে ধীরে। ক্রমেই জটিলতম চিন্তার দুর্গম অঞ্চলে পরিণতি পেয়েছে। ব্যক্তিবিশেষের স্ববিরোধ শিল্পের অঞ্চলে এক অনির্বচনীয় ঢেউয়ের নাম ‘বোধ’। ‘আলো-অন্ধকারে যাই-মাথার ভিতরে/স্বপ্ন নয়-কোন এক বোধ কাজ করে’, কিন্তু সে বোধ কী? সে প্রশ্নের উত্তর মেলে না।
অথচ দুর্বোধ্য সে অনুভূতিপুঞ্জকেই যেন গভীর মমতায় প্রকাশ্য করে তুলতে চেয়েছিলেন। না পেরেই কি একা হয়ে গেলেন? ‘সকল লোকের মাঝে বসে/আমার নিজের মুদ্রাদোষে/আমি একা হতেছি আলাদা?/আমার চোখে শুধু ধাঁধা? আমার পথেই শুধু বাধা?’ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এ বৈশিষ্ট্যই জীবনানন্দ দাশকে রোমান্টিক এবং সমকালীন আধুনিক কবিদের থেকেও ভিন্ন ও বিশিষ্ট এবং বিশ্লিষ্ট করেছে। এটিই তার মহত্তম আধুনিক কবিসত্তার শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, ঘৃণা, অবহেলা—সবই একজন মানুষের মনে কী করে একীভূত হয়ে এক অব্যক্ত বেদনারাশির জন্ম দেয়, তা-ই যেন এ কবিতার মূল বিষয়ে পরিণত।
এটি আধুনিকতাবাদের নৈরাশ্য ও নিঃসঙ্গচেতনা কিংবা বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং অলৌকিকতায় আস্থাহীনতার বৈশিষ্ট্যকে নিশ্চিতির রূপ দেয়। আপন চিত্তের চাঞ্চল্যের কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ কবি। বিস্ময় প্রকাশের ভাষা তার, ‘সে কেন জলের মত ঘুরে ঘুরে একা একা কথা কয়!’ তারপরই বিস্ময়াভিভূত আপন হৃদয়ের কাছেই প্রশ্ন জমা রাখেন, ‘অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?’ অসুখী মানুষ, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতকে সহ্য করেও শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকুতিই প্রকাশ করে। সাঁর্ত্রে কথিত অস্তিত্ববাদী চেতনার এ আরেক বিরল দৃষ্টান্ত। ‘গোধূলী সন্ধির নৃত্য’র সঙ্গে ‘বোধ’ কবিতার অন্তর্গত মিলের চেয়ে অমিলই যেন বেশি। যে অর্থে ‘গোধূলী সন্ধির নৃত্য’ রাজনীতি সচেতন কবিতা, সে অর্থে ‘বোধ’ নয়। প্রথমটিতে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির যোগাযোগকে পূর্ণ করে তোলা হয়েছে, দ্বিতীয়টিতে ব্যক্তির একাকিত্ব, হাহাকারকে চাড়িয়ে দিয়েছেন মানবমনে।
‘অবসরের গান’ কবিতার শুরুতেই ইন্দ্রিয়ঘন উপমা-আশ্রিত চিত্রকল্পে বিস্ময় জাগে। ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/অলস গেঁয়োর মত এই খানে কার্তিকের ক্ষেতে;/মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার,—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ’ পুরো তিন পঙিক্তজুড়েই একটি চিত্রকল্প উজ্জ্বল হয়ে আছে। স্বাদের অবাস্তব রূপের সঙ্গে বাস্তব জগতের সম্মিলন। অলীক উপলব্ধির সংশ্লেষ ঘটানোর অভিনব কৌশলও। যার নাম হয়তো প্রকারান্তরে পরাবাস্তবও হতে পারে। কিন্তু এখানে পরাবাস্তবতা খুঁজে পেতে গেলে বাস্তবতারও সংশ্লেষ ঘটাতে হয়। কার্তিকের মাঠে মাঠে ফসলের উত্সব। কৃষকের মনে আনন্দের হিল্লোল। এতসব আনন্দের ভেতর অলস সময় কাটানোর মতো অফুরন্ত সময় পাড়াগাঁর মানুষের থাকে না। নতুনকে আহ্বান করা ও বরণ করার ভেতরই উচ্ছ্বাসপূর্ণ হয় না। পরবর্তীকালের জন্য সঞ্চয়ও মানুষের চিন্তাবর্গের অনেকটা অঞ্চলজুড়ে জায়গা করে রাখে। তাই ‘পুরোনো পেঁচারা সব কোটরের থেকে’ যখন বের হয়ে আসে অন্ধকারে তখন ‘ইঁদুরেরা চলে গেছে’। খাদ্যচক্রের প্রসঙ্গনির্ভর এ চিত্রকল্পের প্রাণিজগতের অনিবার্য সত্য চিত্রায়িত। আবার এ দৃশ্য ইয়েটসকে মনে করিয়ে দেয়।
ইয়েটসেও কেবল ইঁদুর আর পেঁচার আনাগোনা। কিন্তু ইয়েটসের কবিতায় যে অর্থে প্যাস্টোরাল কবিতার গন্ধ খুঁজে পান সমালোচকরা, সে অর্থে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কোনো গ্রাম্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। অথচ দু’জনই গ্রামের দৃশ্য এঁকেছেন। অবসরপ্রিয় মানুষের চোখ দেখে ‘আকাশের মেঠোপথে থেমে ভেসে চলে চাঁদ’। কারণ ‘সকল পড়ন্ত রোদ চারিদিকে ছুটি পেয়ে জমিতেছে এইখানে এসে’। শীতের শেষে বসন্ত, বসন্ত শেষ না হতেই গ্রীষ্মের আলস্য মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। অনেকটা ‘গ্রীষ্মের সমুদ্র থেকে চোখের ঘুমের গান আসিতেছে ভেসে’ ধরনের বার্তাও শোনা যায়।
‘মৃত্যুর আগে’ কবিতায় চিত্রকল্পের বিপুল সমাহারে বিস্ময় জাগে। ‘আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়’ বলে সময়নির্ভর চিত্রকল্পের আশ্রয়ে কবিতার শুরু। যেখানে চাঁদ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল, সেখানে জোনাকিরা অন্ধকার দূর করে দেয়। এমন শীতে ‘মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার’ শুনেও পুরনো পেঁচার ঘ্রাণের সন্ধান করে সুলুকসন্ধানী মন। অপরূপ শীতের রাতে অশত্থের ডালে ডালে বক ডেকে ওঠে। ‘বুনো হাঁস শিকারীর গুলির আঘাত’ এড়িয়ে দূরে চলে গেলে ‘সন্ধ্যার কাকের মত আকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে নিত্যদৃশ্যে অভ্যস্ত হয় সংসারী মানুষ। সবুজ পাতা অঘ্রাণের অন্ধকারে হলুদ হয়ে এলে ‘মিনারের মত মেঘ সোনালি চিলেরে তার জানালায় ডাকে’ চিত্রকল্পে জীবনানন্দ দাশের স্বতঃসিদ্ধ অভিপ্রায় হলেও এর ভেতরই মৃত্যুর করুণ দৃশ্যও উঁকি দেয়। তাই ‘সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মত এসে জাগে/ধূসর মৃত্যুর মুখ’ তখন মৃত্যুর আগে আরও একবার বেঁচে থাকার আকুতি জানানোর আকাঙ্ক্ষাও জাগে।
‘আটবছর আগের একদিন’ একটি জটিল কবিতা। কী অর্থে জটিল—বোধের দিক থেকে, না কি প্রকাশের দিক থেকে? যাপিত জীবনের প্রতি ব্যক্তির বিবমিষা জন্মে, তাই কোনো কার্যকারণ সম্পর্কে পারম্পর্য রক্ষা না করেই স্বেচ্ছামৃত্যুকে শ্রেয় জ্ঞান করে কবিতার নায়ক। আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ, নৈরাশ্যই তাকে জীবনের সমস্ত প্রাচুর্য উপেক্ষা করে আত্মহননের দিকে প্ররোচিত করে—যে রকম ঘুম একজন মানুষের কাম্য হতে পারে না, সে ঘুমই তার জোটে। তার মনে হয়, জেগে থাকাই যেন গাঢ় বেদনা ভরা। সে বেদনার ভার তাকে আর সহ্য করতে হবে না। শেষোক্তি শোনায় ‘চাঁদ ডুবে চলে গেলে-অদ্ভুত আঁধারে/যেন তার জানালার ধারে/উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে।’ শেষ পঙিক্তর উপমা-আশ্রিত চিত্রকল্পে ফুটে ওঠে একটি বিশেষ বিষণ্ন সময়ের ভয়াবহ চিত্র। যাপিত জীবনের ক্লেদজ অভিজ্ঞতার ভিড়ে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষের কাছে লাশ কাটা ঘরের স্পন্দনহীন হিম ঘুমই শ্রেয় মনে হয়। আবার ‘রাত্রি’ কবিতায় ‘হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল’ বলে যে বিশেষ মুহূর্ত ও মানসিক অবস্থার বিবরণ পেশ করা হয়েছে, তার শেষ টেনেছেন ‘নগরীর মহত্ রাত্রিকে তার মনে হয়/লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।/তবুও জন্তুগুলো আনুপূর্ব—অতিবৈতনিক/বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবত’ দিয়ে। নগরের ক্লেদজ ও মমতাহীন যাপিত জীবনের নির্মম বহুরৈখিকতায় ঋদ্ধ এ চিত্র।
তবে এখানেও কবি উপমা নির্মাণের ক্ষেত্রে নাগরিক জীবন আর পশুর স্বভাবগত পার্থক্য ঘুচিয়ে দেন। তার মূলেও উপমাশ্লিষ্ট চিত্রকল্প। জীবনানন্দ দাশে রূপকধর্মী চিত্রকল্প তেমন স্পষ্ট নয়। প্রতীকধর্মীও নয়। সর্বত্রই উপমাশ্রয়ী চিত্রকল্পের প্রাচুর্য। ‘হায় চিল’ থেকে শুরু করে ‘রূপসী বাংলা’র কবিতাগুচ্ছ। ‘হায় চিল’ কবিতার ‘তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে’ পঙিক্তও মানবমনের জটিল ঘূর্ণাবর্তের তীরে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত সত্যের নাম।
‘ক্যাম্পে’ নামক সে জটিল চিন্তাশ্রয়ী কবিতা, সেখানেও উপমাশ্রয়ী চিত্রকল্প। ‘মৃত পশুদের মত আমাদের মাংস লয়ে আমরাও পড়ে থাকি’ পঙিক্তও উপমাকে আশ্রয় করে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা চিত্রকল্প। ‘শ্যামলী’ কবিতায় সমকালের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে চিরকালীন দিগ্বলয় স্পষ্ট। জীবনানন্দ দাশের কাব্যবিশ্বে উপমা, উেপ্রক্ষার প্রাচুর্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে চিত্রকল্পের অমোঘ স্বাক্ষরও। এ কথা বলা অসঙ্গত হবে না যে, ‘নক্ষত্রের রূপালী আগুন ভরা রাত’-এ পরিপূর্ণ জীবনানন্দ দাশের কাব্যবিশ্ব।

কবিতার চিত্রকল্প, কালিক চেতনার ধারা // ফকির ইলিয়াস

বর্তমান কবিতাগুলো কি আসলেই খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে? নাকি ঝাপসা চিত্রকল্প এবং উপমার সমুদ্রে খেই হারিয়ে ফেলছেন পাঠক? ঝাপসা কিংবা কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের সুর্যোদয় যারা অবলোকন করেন তারা কি শুধুই স্বপ্নবিলাসী? এমন অনেকগুলো প্রশ্ন আজকাল প্রায়ই শোনা যায়| আবার কেউ কেউ আধুনিক অনেক গদ্য কবিতায় তাদের ছন্দের ব্যারোমিটার বসিয়ে দুরবীন দিয়ে দেখার চেষ্টাও করেন| কখনো তারা সফল হন| কখনো তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়| আবার কেউ কেউ নিজেকে ছান্দসিক কবি ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভে আটখানা হন| স্বপ্নবিলাস— তা যাই হোক না কেন, কবিতা যে এগিয়ে যাচ্ছে তাই হচ্ছে বর্তমানের প্রকৃত বাস্তবতা| কোন্ কবিতা কালোর প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে তা অতীতে যেমন বলা যায়নি, বর্তমানেও বলা যাবে না| উদাহারণ স্বরূপ জীবনানন্দকে আবারো প্রণাম করি| শতাব্দীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত তার বিচরণ আমাদেরকে আশান্বিত করেছে বৈকি! তার আধুনিক চেতনা এবং নান্দনিক প্রত্যয় কালের বাহক হয়েই থেকে যাচ্ছে— যাবে বহুবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত| তা এ মুহুর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে| কবিতা লেখাকে অনেক কবি মৌলতাত্বিক এবং সমসাময়িক আর্টিস্টিক বলে মনে করেন| তাদের এমন ধারণার পেছনে যুক্তিও আছে প্রচুর| কারণ অনুভবের অনুসৃতি এবং প্রার্থনার চেতনা তো হৃদয় থেকেই উৎসারিত হয়| একজন মানুষ চোখ খোলা রেখে অনেক কিছু দেখতে পায়| আবার চোখ বন্ধ করেও অনেক কিছু দেখতে পায়| একথা আমরা সবাই জানি এবং বুঝি| কিন্তু হৃদয়ের চোখের আয়নায় দাঁড়াতে পারি কজন? কবিতার কল্পচিত্র সব সময়ই বিশ্বজনীন এবং সার্বজনীন|

এ প্রসঙ্গে আমি কয়েকজন মার্কিন কবির সমসাময়িক কবিতার বাংলা তর্জমার কিছু খন্ডচিত্র তুলে ধরতে চাই| এরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃত কবি| যারা কবিতার ব্যঞ্জনা এবং ঘূর্ণায়নের মাধ্যমে শৈল্পিক আবহকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন| ‘সোনালি মানুষ’ কবিতায় কবি ডানা লোভন সোনালি মানুষটিকে এভাবেই নির্মাণ করেন— ‘এবং এসিড এসে ধৌত করে দেয় তাকে,/ হ্যাঁ, আমি ছোট্ট মানুষটিকে নির্মাণ করছিলাম|’ একটি কবিতা তখনই প্রকৃত সার্থকতা পায়, যখন একটি একান্ত ব্যক্তিগত অনুভুতি সার্বজনীনতা লাভ করে| একটি হৃদয়ের আকাঙ্খা হয়ে ওঠে বহূ হৃদয়ের প্রভাষণ| কবি ক্যাথরিন লিডিরার তার ‘বেঁচে থাকার একটি নতুন পথ’ কবিতাটির মুখবন্ধ শুরু করেছেন এভাবে— ‘আমি ক্লান্ত এভাবে ক্ষমা করতে করতে/ একটি রাত, একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ ফোরাম যেমন/ একটি মধ্যতর্জনী’।
একটি কবিতায় বহুমাত্রিক অনুযোগ কিংবা অনুপ্রাস কবিতাটিকে সমৃদ্ধ করে নি:সন্দেহে| যেকথা অনেকে বলতে কিংবা লিখতে পারেন না,- তা কবি পারেন| সেক্ষেত্রে কবি তার উত্তর প্রজন্মের জন্য নির্মাণ করেন একটি বিশুদ্ধ নিবাস| কবি জন ইয়াউ-এর তেমনি কিছু কথা আমাদের কানে বাজে, বুকে লাগে| তার ‘রাশিয়ান চিঠি-৩’ কবিতার কয়েকটি পঙক্তি— ‘প্রিয় মেঘের চিত্রকর/ কি প্রমাণ থাকবে সেখানে/ যখন দোকানী/ আমাদের ধুলিচিহ্ন ঝেড়ে ফেলে দেবে ছোট্ট নালীতে’| একইভাবে কবি ডানা লোভন-এর আহ্বান জাগিয়ে তোলে তার সহযাত্রী অনুজদেরকে| ‘কাজ’ কবিতায় তার বাণীগূলো এরকম— ‘এই সেই আমেরিকা—/ তুমি পাত্রের মধ্যে পানি রাখো| এই সেই তোমার শতাব্দী—/ যে চুলোয় তুমি আগুন জ্বালো/ তুমি অনুভব করো, এই শহর, তোমার চারদিকের ধুসর, যেভাবে তুমি কালো চা রাখো কাপের মাঝে|’
যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক অন্যতম প্রধান কবি মি. জিরাল্ড স্টার্ন-এর স্বগতোক্তি থেকে কালিক কবিতা নির্মাণে চিত্রকল্পের ব্যবহার সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে| স্টার্ন বলেন, আমার কবিতায় আমি আমার সময়কেই ধরে রাখতে চেয়েছি| বর্তমানই ছিল আমার কাছে মূল বিবেচ্য বিষয়| জীবনের রঙ অনেকটাই তো ফ্যাকাশে| মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যে জন এগিয়ে আসতে পারে সেই হয় ভাগ্যবান জীবনের অধিকারী| কবিতায় সমসাময়িক বিষয় এবং চেতনার ব্যাপৃতি— বর্ণনা থাকা স্বাভাবিক| শত বছর আগে
একজন কবি কম্পিউটার, ই-মেইল, ইন্টারনেট সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না| বর্তমানের কবিরা এই গ্লো­বাল ভিলেজে বসবাস করে এসব বিষয়গুলোকে রপ্ত করছেন মনে প্রাণে| তাদের চিন্তা চেতনায় এখন সিলিকন ভ্যালি| আলোর ঝলক| একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তাই তো,মাইকেল ও’ নীল বলে যান— ‘আমি ক্রমশ: শব্দগূলোকে বন্দী করছি একটি দুর্দান্ত বাক্সের ভেতর/ ফুলগুলো যেন ফুটছে আমার হাত দিয়ে সবুজ গোপনগুলো স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে একটি কালো জমিনের বিপরীতে/ এভাবেই মধ্যরাতের আন্ত:জালে (ইন্টারনেটে) আমি খেলছি তোমার সাথে|’
আধুনিক চিত্রকল্পগুলো, আধুনিক মননের বুনন| এ বুনন তখনই আরো সমৃদ্ধ হয় যখন একটি কবিতার শিল্পায়ন ঘটে আন্তর্জাতিকতার নিরিখে| যারা পশ্চিমা সাহিত্যের বিবর্তনকে ধনবাদী আধুনিকায়ন বলে নাক সিটকান তাদের অবগতির জন্য বলতে হয়, যে প্রক্রিয়া পাশ্চাত্যে শুরু হয়েছে অর্ধশতাব্দী আগে, প্রাচ্যে এখন তার অনুকরণ চলছে| অতএব যদি চলমান সময়কে কবিতায় ধারণ করা না যায়, তবে হয়তো দু’ যুগ পরে আজকের কবি এবং কবিতা স্বকীয়তা নিয়ে আলোচনায় আসতে পারবেন না| বাংলা সাহিত্যের অনেক স্বনামধন্য কবি আছেন যারা বলেন, বর্তমানে কবিতার কিছুই হচ্ছে না| প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে— তারা কেন কিছু করছেন না| বা করার চেষ্টা করছেন না| একবিংশ শতাব্দীর শূরুতে দাঁড়িয়ে ক্ষণিক পিছন ফিরে তাকালে বেশ কিছু উত্থান চোখে পড়বে| বেশ কিছু আধুনিক কবি তাদের চিত্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে যে চিহ্নতত্ত্ব সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন তা নিয়ে হয়তো বিশদভাবে আলোচনা হবে সময়ে— ভবিষ্যতে| কবিতার চিত্রকল্প সব সময়ই গতিশীল| আর কবিরা সেই গতির শক্তি নিয়েই কালের দিকে ধাবমান|

দুই.
মনে পড়ছে একদিন টিএসসি তে আড্ডা দিচ্ছিলাম আমি , কবি মোহন
রায়হান ও রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ । এ সময় আমার আরেক বন্ধু এগিয়ে আসেন । রুদ্র হাত বাড়িয়ে দেন। বলেন , ''আই এ্যাম রুদ্র মুহম্মদ
শহীদুল্লাহ , দ্যা পোয়েট ।'''
মোহন ভাই হেসে ফেলেন। রুদ্র তার হাসি মুখে বলেন, ইয়েস, আই
এ্যাম দ্যা পোয়েট । তা বলবো না ?
হাঁ, একজন প্রকৃত কবির আত্মপ্রত্যয় এভাবেই সুদৃঢ় । কারণ তিনি জানেন ,তিনি কি করছেন।
এ প্রসংগে ময়মনসিংহের এক প্রখ্যাত বাউল মরমী কবি উকিল মুন্সীর
কথা আমার সব সময় মনে পড়ে। তাঁর একটা নন্দিত গান আছে,
'' আমি আগে না জানিয়া সখীরে কইরে পিরীতি /
আমার দু:খে দু:খে জনম গেলো , সুখ হইলো না এক রতি।''
এই গানটি এখনো মুখে মুখে ফিরে । কেন ফিরে? কারন মানুষ এখনো
বাউল উকিল মুন্সীর আত্মায়, প্রতিকৃতিতে নিজেকে খুঁজে পায়।
একজন কবির সার্থকতা সেখানেই।
কবিতার ভাষার প্রকাশভংগী বদলায় কালে কালে। বদলায় কবির বলার
ধরন। কিন্তু চন্দ্র , সূর্য, গ্রহ , নক্ষত্র , সমুদ্র , পর্বত সহ প্রকৃতির সিংহ ভাগ
যেমন ছিল , তেমনি থেকে যায়। কবিতা বার বার আসে কালের আবর্তনে।
কবির নতুন ধ্যানে .. চিত্রনে । কবিতার চিত্রকল্প, কালিক চেতনার ধারা
ফকির ইলিয়াস

Tuesday, June 9, 2015

কবিতার দুর্বোধ্যতা ও পাঠক চিন্তা কিছু ভাবনা // সুমন আহমেদ

একজন পাঠকের কাছে আধুনিক কবিতা কতটা অস্পষ্ট এবং দুর্বোধ্য এই নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এই ক্ষেত্রে  আধুনিক না বলে সমকালীন শব্দটিও  প্রয়োগ করা যায়। আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে দুর্বোধ্যতা কিংবা অস্পষ্টতার অভিযোগ সব সময়ই ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই দুর্বোধ্যতার মাপকাঠি কিভাবে নির্ধারিত হয় ? কবিদের লেখা কবিতা না বোঝার ব্যর্থতার দায় কি শুধু কবিদের একার, নাকি পাঠকেরও রয়েছে ?
 

 কেউ কেউ বলে থাকেন কবিতা না বুঝে উঠার ব্যর্থতা সম্পূর্ণ পাঠকের, এতে কবির কিছু করার নেই। আবার অনেকেই এই মতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে কবিতার দুর্বোধ্যতাকেই দায়ী করে দায়ভার কবির উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং বিশ্লেষণও কম হয়নি। ভবিষ্যতে হতেও থাকবে।

একটা সময় ছিল যখন কবিদের সাথে পাঠকের সংযোগ হওয়াটা ছিল দুরূহ এবং অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। কারণ সেই সময় কবিরা পাঠকের হাতের নাগালে ছিল না। সেই সময় কবিতার সমালোচনা পড়ার জন্যে নির্ভর করতে হতো কাব্য সমালোচকদের লেখা প্রকাশিত প্রবন্ধ কিংবা বোদ্ধাদের সভা-সেমিনারে গুরুগম্ভীর আলোচনা শোনার জন্যে ঠায় বসে থাকা।বলা যায় ব্লগকেন্দ্রিক বাংলা কবিতার প্রসারতা  এবং ইন্টারনেট ব্যাবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে কবি ও পাঠকের মধ্যে ভাব বিনিময়ের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ও যোগাযোগের একটি যুগান্তরকারী পদক্ষেপ স্থাপিত হয়েছে ইতিমধ্যেই। আর এই লাগসই প্রযুক্তির কল্যাণে পাঠক হিসাবে ব্লগে প্রকাশিত কবিতা বোঝা গেল কি বোঝা গেলনা এই অভিযোগের ব্যক্তিগত কৈফিয়তটি এখন সরাসরি কবির দরবারে উপস্থাপন করা সহজ হয়ে পড়েছে
। ফলে কবিতার  দুর্বোধ্যতা নিয়ে কবি ও পাঠকের মধ্যে প্রত্যক্ষ লড়াই এখন জলন্ত ইস্যু। যেটি আগে কল্পনাও করা যেত না।  

আসলে এই দুর্বোধ্য শব্দটির মাপকাঠি কিভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে এই প্রশ্নটি একজন পাঠক হিসেবে আমার কাছেও মূখ্য হয়ে দাঁড়ায় তখন যখন দেখি ব্লগে প্রকাশিত কবিতায় পাঠকের মন্তব্যে 'কিচ্ছু হয়নি', 'বুঝিলাম না', কিংবা 'কিছুই বুঝিলাম না' এমন সব মন্তব্যে ভরপুর থাকে।এইখানে আমি কোনো নির্দিষ্ট ব্লগের কথা উল্লেখ না করে সামগ্রিক কবিতাকেন্দ্রিক বাংলা ব্লগের কথা বলছি। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং একজন কাব্যপাঠক হিসেবে অনুভূতিটুকু বলার প্রয়াসে এই লেখাটির অবতারণা।

দুর্বোধ্য মানে কি উচ্চারণে কঠিন শব্দ ? নাকি শব্দের সঠিক অর্থ পাঠকের জানা না থাকা। বাংলা ভাষায় অনেক অপ্রচলিত শব্দ রয়েছে যার অর্থ একজন পাঠক হিসেবে আমি নাও জানতে পারি। আমার এই না জানার দৈন্যতাকে আমি শব্দের দুর্বোধ্যতা ভেবে  এর দায় কবির উপর চাপিয়ে দিতে পারি কি? আমার না বোঝার দায় কবির উপর বর্তাবে কেন ? এইটি হলো একটি দিক।

অন্যদিকে সহজভাবে লেখা কবিতাও কী খুব সহজে বোঝা যায়? অনেক আধুনিক কবির সহজ ভাষায় লেখা অনেক কবিতা আছে যা সহজে উপলব্ধিতে আনা দুরূহ হয়ে পড়ে। এই সহজ এবং জটিল বিষয়টি আপেক্ষিক। সহজ শব্দের গাথুনিতে বিমূর্ত ভাবধারার কারণেও পাঠক কবিতার অর্থোদ্ধারে তাঁর ইচ্ছাশক্তি  হারিয়ে ফেলে।এই ধরনের কবিতার অনেক উদাহরণও দেয়া যেতে পারে এখানে। লেখাটির কলেবর না বাড়ানোর তাগিদ থেকে উদাহরণ দেয়া থেকে বিরত থাকলাম। আসলে নান্দনিক এবং শৈল্পিক মনের ভাবনায় নিজকে নিবেদিত করতে না পারলে কবির কবিতায় যে শৈল্পিক আঁচর থাকে পাঠক কিভাবে তাঁর মর্মোদ্ধার করবে? এর দায়ভারও কি কবিকে বহন করতে হবে?

কবিতার চরণ থেকে শুধুমাত্র আক্ষরিক অর্থ বের করে কবিতা বোঝার চেষ্টা সবসময় সার্থক নাও হতে পারে। এই বিষয়টি পাঠককে কবিতা পঠনের সময় মনে রাখতে হবে। কবিতা পাঠে পাঠককের মননশীলতা এবং কবিতার রহস্যময়তা বিবেচনায় আনতে না পারলে একজন সার্থক কবিতা পাঠক হওয়া দুরূহ বটে। অনেকেই মনে করে থাকেন রহস্যময়তা কবিতার প্রাণ।আর এই রহস্যময়তার সৌন্দর্য ও শক্তির কারণেই কবিতা আলাদা হয়ে যায় গদ্যসাহিত্য থেকে।এখানেই গদ্যসাহিত্য থেকে কাব্যের স্বাতন্ত্রতা।

কবিতার দুর্বোধ্যতা কিংবা অস্পষ্টতার অভিযোগের কারণেই কোনটি কবিতা আর কোনটি অকবিতা এই প্রশ্নটি আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে বেশ জোরালো হয়ে দেখা দেয়। কোনটি কবিতা এবং কোনটি নয়, এর সীমারেখা আদৌ টানা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত ?এই নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে।এই ক্ষেত্রে কেউ কেউ কবিদের স্বেচ্ছাচারিতার কথাও বলে থাকেন। তবে আমার সহজ একটি উপলব্ধি হলো কবিতা তো সভা-সেমিনারের পঠিত কারো ফরমায়েশি 'কী-নোটস' নয় যে, চার দেয়ালের কক্ষে উপবিষ্ট নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রোতা-দর্শকদের জন্যেই রচিত হবে? কবি যা অনুভব করেন তাঁর আত্মদহনের চিত্রকল্প নিজের মত করে সাজিয়ে তোলেন স্বাধীনভাবে। কবির ভাবনা কখনো পাঠকের ভাবনার সাথে মিলে যেতেও পারে আবার নাও মিলতে পারে।পাঠকের না বোঝার দায় কবির উপর ছেড়ে দিলে সংবেদনশীল লেখক তাঁর অপার সম্ভাবনাময় জগৎ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।

বাঙালি মাত্রই কবিতার প্রতি যেমন রয়েছে গভীর ভালবাসা তেমনি কবি ও কবিতার প্রতি বিদ্রুপ করাও ততটাই আবেগী বিষয়। কবি অথবা কবিতা নিয়ে ব্যঙ্গ উক্তি যতটা তাচ্ছিলের সাথে সহজে করা যায় কিংবা হয়ে থাকে সাহিত্য চর্চার  ক্ষেত্রে অন্য কোনো  শাখায় ব্যঙ্গ চর্চা ততটা জনপ্রিয় নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এর কারণটা অনুধাবন করতে হলে বুঝতে হবে বিদ্যমান সমাজ কবিদের কোন চোখে দেখে থাকে। অথবা একটু ঘুরিয়ে বললে সমাজে কবিদের সামাজিক মর্যাদা কতটুকু। জনশ্রুত আছে কবি পত্নীরাও নাকি কবিদের সামাজিক মর্যাদাকে খাটো করেই দেখেন। আর কান পাতলে এও তো শোনা যায় কবিতার পাঠক অপেক্ষা কবির সংখ্যাই নাকি বেশি। প্রচলিত এই কথাটি দিয়ে মূলত কবি ও কবিতার প্রতি কথকদের বিদ্রুপ চেতনাই প্রকাশ পায়।

আমার কাছে মনে হয় কবিতা পাঠ উপলব্ধির ব্যাপার। শিল্পকে উপলব্ধিতে এনে বোঝার কাজটা প্রথমে সেরে নিতে পারলে কবিতার অর্থোদ্ধারে মনোনিবেশ করা সহজ হয়।কবিতার পাঠোদ্ধার নির্ভর করে পাঠকের মননশীলতা,শিক্ষা এবং রুচি বোধের উপর। 'সকলেই কবি নন, কেউ কেউ কবি’- জীবনানন্দ দাশের এই বাণীকে যখন আমরা আলোচনায় নিয়ে আসি তখন আমরা এই  কথাটি বললে অত্যুক্তি হবে কি (?) 'সকলেই কবিতার পাঠক নয়, কেউ কেউ পাঠক’ !! আমার কাছে পুরো বিষয়টি মনে হয় আপেক্ষিক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। একজনে যা পারেন বা বোঝেন অন্যজন তা নাও বোঝতে পারেন।কবিতার দুর্বোধ্যতা এবং অস্পষ্টতা পাঠকের অভিযোগ হলেও এই দায় শুধুই কবির নয়, কিছুটা পাঠকের
ও  বটে।

আবুল হাসান: জীবনে ও কবিতায়

১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট তৎকালীন ফরিদপুর জেলার টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে নানার বাড়িতে কবি আবুল হাসান জন্মগ্রহণ করেন। বর্নি গ্রাম তাঁর ভীষণ প্রিয়- যার প্রমাণ আমরা ‘পাখি হয়ে যায় প্রাণ’ কবিতায় দেখতে পাই। আবুল হাসানের প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া, পরবর্তীতে আবুল হাসান নামে কবি খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘টুকু’। ১৯৫৩ সালে বর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তারপর ‘ছিল্না-গুয়াদানা’ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। বাবার চাকরির সুবাদে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। আরমানিটোলা স্কুলে পড়ালেখার সময় থেকেই আবুল হাসান নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯৬৩ তে এস.এস.সি, ১৯৬৫ সালে তিনি ব্রজমোহন মহাবিদ্যালয় থেকে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

১৯৬৫ সালে আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন সম্পন্ন করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই হাসান সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি ঢাকার তরুণ কবিদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আসেন এবং আস্তে আস্তে পদার্পণ করেন ‘উদ্বাস্তু-উন্মুল’ যৌবনে। পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলে আবুল হাসান অর্থের প্রয়োজনে পত্রিকায় চাকুরি নেয়ার কথা ভাবেন। ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে তিনি দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় বার্তা বিভাগে সাংবাদিকতা শুরু করেন। কিন্তু মাত্র তিন মাস পরে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। কোন পত্রিকাতেই তিনি একটানা বেশি দিন কাজ করেন নি।

১৯৭২ সালের প্রথম দিকে আবুল হাসান ‘গণবাংলা’ পত্রিকায় যোগ দেন। ‘গণবাংলা’-য় তখন সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন কবি শহীদ কাদরী। সাহিত্য বিভাগে শহীদ কাদরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ‘গণবাংলা’-য় তিনি কর্মরত ছিলেন। তারপর তিনি যোগ দেন আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক ‘জনপদ’ পত্রিকায়। ‘জনপদ’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালের ২৪ জানুয়ারি। এ পত্রিকায় প্রথম দিন থেকেই আবুল হাসান সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘জনপদ’ পত্রিকায় তিনি ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাহিত্য সম্পদনা করেন। এই দেড় বছরে ‘জনপদ’ পত্রিকায় আবুল হাসানের অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছে-এর মধ্যে আছে কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধ। এই পত্রিকায় তিনি ‘আপন ছায়া’ এবং ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক কলামটির প্রথম চার সংখ্যা তিনি ‘ভ্রামণিক’ ছদ্মনামে লিখেছেন। ১৯৭৪ সালের জুন মাসের শেষের দিকে আবুল হাসান ‘জনপদ’ পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে সহ-সম্পাদক হিসেবে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগ দেন। কবি আল মাহমুদ-সম্পাদিত ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় আবুল হাসান ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় তিনি ‘আড়ালে অন্তরালে’ এবং ‘বৈরী বর্তমান’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। এছাড়া ‘ফসলবিলাসী হাওয়ার জন্য কিছু ধান চাই’ শীর্ষক একটি উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধ রচনা করে সেই সময় তিনি লেখক হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৭০ সালটি আবুল হাসানের জীবনে বিশেষ তাৎপর্যবহ। কারণ ‘শিকারী লোকটা’ শিরোনামে একটি কবিতার জন্য এ সময় তিনি সমগ্র এশিয়াভিত্তিক এক প্রতিযোগীতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিশেষ পুরষ্কার লাভ করেন। পরে ওই কবিতাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সমগ্র পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের কবিতা-সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৭০) শীর্ষক ওই গ্রন্থে তদানীন্তন পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি আবুল হাসানের কবিতা স্থান পায়।

আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে। ‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আবুল হাসানের কবি খ্যাতি বিস্তার লাভ করে। এরপর অসুস্থতার বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রামী আবুল হাসানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’ প্রকাশ করে ঢাকার প্রগতি প্রকাশনী ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আবুল হাসান তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’র পাণ্ডুলিপি তৈরি থেকে শুরু করে প্রুফ দেখা সবটাই করেছেন। সন্ধানী প্রকাশনী থেকে ‘পৃথক পালঙ্ক’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে। তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পর ১৯৮৫ সালে নওরোজ সাহিত্য সংসদ প্রকাশ করে ‘আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা’। মূলত কবি হলেও আবুল হাসান বেশ কিছু সার্থক ছোটগল্প রচনা করেছেন। ১৯৬৯ সাল থেকে ঢাকায় বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িকপত্রে তাঁর গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। তবে জীবিত অবস্থায় তাঁর কোন গল্প-সঙ্কলন প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পনের বছর পর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর নয়টি গল্পের সঙ্কলন ‘আবুল হাসান গল্পসংগ্রহ’। কবিতা-গল্প ছাড়াও আবুল হাসান প্রবন্ধ এবং নাটক রচনা করেছেন। ‘ওরা কয়েকজন’ শীর্ষক একটি কাব্যনাটক তাঁর মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’-য় (১২.১২.১৯৭৫) প্রকাশিত হয়, যা স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয় ১৯৮৮ সালে। জার্মানি থেকে ফিরে এসে আবুল হাসান ‘কুক্কুরধাম’ নামে একটি বৃহৎ কাব্য রচনার পরিকল্পনা করেন। এর বেশ কিছু অংশ তিনি রচনাও করেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি তা আর শেষ করতে পারেননি। আবুল হাসান সেকালের স্বভাব-কবির মতো অবিশ্বাস্য দ্রুততায় একটি তরতাজা কবিতা লিখে দেয়ার মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন।

শৈশব থেকেই আবুল হাসান বাত-জ্বরের রোগী ছিলেন। কখনো সুচিকিৎসা হয়নি বলে যৌবনে পদার্পনের পূর্বেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাঁর হৃদপিণ্ড সম্প্রসারণজনিত ব্যাধি প্রথম ধরা পড়ে ১৯৭০ সালে। ওই সময় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে মুক্তিলাভের পর অনিয়ন্ত্রিত জীবন, অনিয়মিত খাওয়া, অমানুষিক পরিশ্রম এবং রাত জাগার অভ্যাস আবুল হাসানকে দ্রুত হৃদরোগে জর্জরিত করে তোলে। দিন দিন তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি পুনরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আরো বেশি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে শারীরিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে তাঁকে ভর্তি করা হয় ঢাকার হলিফ্যামিলি হাসপাতালে। কিন্তু আরোগ্যলাভের কোন লক্ষণ দেখা না দেয়ায় তাঁকে পি.জি. হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু এখানেও আরোগ্যলাভের কোন সম্ভাবনা দেখা না দেয়ায় চিকিৎসকরা তাঁকে বিদেশে যাবার পরামর্শ দেন। এ অবস্থায় কয়েকজন বন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এবং বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে তাঁকে চিকিৎসার জন্য পূর্ব জার্মানি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশ এবং পূর্ব জার্মানির মধ্যে সম্পাদিত সাংস্কৃতিক চুক্তির শর্তানুযায়ী পূর্ব জার্মান সরকারের অর্থানুকূল্যে আবুল হাসানকে খুব দ্রুত পূর্ব জার্মানি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর আবুল হাসান খানিকটা সুস্থ হয়ে হয়ে ওঠেন এবং হাসপাতালের বেডে শুয়েই তিনি আবার কবিতা লিখতে শুরু করেন। কখনো কখনো তিনি হাসপাতালের অদূরে গ্রীষ্মনিবাসে বেড়াতেও যেতেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে শিল্পী গ্যাব্রিয়েলার সঙ্গে। গ্যাব্রিয়েলার সঙ্গে তিনি বার্লিনের বহু জায়গায় ঘুরেছেন এবং একাধিকবার শহরতলীতে অবস্থিত গ্যাব্রিয়েলার বাসায় বেড়াতেও গেছেন। ১৯৭৫ সালের শুরুতেই আবুল হাসান পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। জার্মান ডাক্তাররা তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে তাঁকে চেকোস্লোভাকিয়ায় চিকিৎসার জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তাঁর হৃৎপিণ্ড ততদিনে প্রায়-অকেজো হয়ে গেছে, যা সারিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন জটিল অস্ত্রোপচার। এ সময় বার্লিনস্থ এ.পি.এন.-এর সংবাদদাতা ভারতীয় নাগরিক প্রকৌশলী সুনীল দাশগুপ্ত এবং তাঁর জার্মান বংশোদ্ভুতা পত্নী বারবারা দাশগুপ্তের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আবুল হাসানকে চেকোস্লোভাকিয়া বা অন্য কোন দেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকার জন্য সে দেশের চিকিৎসকরা অপারেশনের ঝুঁকি নিতে চাননি। এই জটিল পরিস্থিতিতে বার্লিনস্থ চ্যারিটি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ আবুল হাসানকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আবুল হাসান চ্যারিটি হাসপাতাল থেকে
মুক্তিলাভ করে সপ্তাহখানেক তাঁর জার্মান-বান্ধবী গ্যাব্রিয়েলার বাসায় ছিলেন। তারপর ১৯৭৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে বার্লিন ত্যাগ করেন।

১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা পৌঁছে আবুল হাসান তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হাসানের সাময়িক সুস্থতা দেখে তাঁর বন্ধুরা কিছুটা আশ্বস্ত হন। এ অবস্থায় আবুল হাসান চাকরির চেষ্টা করতে থাকেন। অনেকেই তাঁকে আশ্বাস দেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই তা রক্ষা করেননি। হাসানের অসুস্থতার কথা বিবেচনা করেই কেউ তাঁকে চাকুরি দেননি, কেননা, তাহলে পরিশ্রমজনিত ক্লান্তিতে তাঁর অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পাবে- এই ছিল তাঁদের ধারণা। এ সময় চাকুরির সন্ধানে তিনি একবার বরিশাল শহরেও যান, কিন্তু ওখানেও কোনো সুবিধা হয়নি। একদিকে অসুস্থতা, অন্যদিকে বেকার-জীবন মাথার ওপর ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ যোগানোর দায়িত্ব- সব কিছু মিলিয়ে আবুল হাসান তখন এক অস্থির জীবন যাপন করেছেন। ক্রমে তিনি পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে পি.জি. হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পি.জি. হাসপাতালে তিনি ভর্তি হন ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর। হাসপতালের বেডে শুয়ে বুকের অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছর বয়সে আবুল হাসান মৃত্যুবরণ করেন। ওই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে তাঁর নামাজে-জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর তাঁর মরদেহ ঢাকার বনানী গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পর তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। স্বল্প-পরিসর জীবনে মাত্র দশ বছরের সাহিত্য-সাধনায় আবুল হাসান নির্মাণ করেছেন এক ঐশ্বর্যময় সৃষ্টিসম্ভার, যার ভিতর দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। তিনি তাঁর স্বল্প সময়ে সাহিত্যের অনেক শাখা প্রশাখায় বিচরণ করেছেন। খোঁজার চেষ্টা করেছেন শান্তি, শিল্প এমনকি নিজেকেও। আমরা যারা তাঁর পাঠক, আমরাও আমাদের মতো করেই তাঁর কবি পরিচয় খুঁজে বের করতে চাই। তাঁর ‘পৃথক পালঙ্ক’ কাব্যগ্রন্থের ‘ঝিনুক নীরবে
সহো’ কবিতাটি, কবির পরিচয় এই কবিতা দিয়েই শুরু করা যাক।

ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও,
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!

এ কোন ঝিনুক যে নিরবে সহে যায়, শুধুই নিরবে সহে যায় আর মুক্তা ফলায়?
কার জন্য ঐ মুক্তা, কেনই-বা ঝিনুক মুক্তা ফলাবে? এই প্রশ্নগুলো কবির মনে
কিভাবে দাগ কেটেছিল, কিংবা আদতেই দাগ কেটেছিল কিনা? নাকি দাগ
কেটে- ক্ষতও সৃষ্টি করেছিলো? তিনি কি খনি শ্রমিককে দেখতে পাননি? নাকি তিনি মনির পূজারী? এক নাদান পাঠক হিসেবে এই প্রশ্নগুলো অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। পাঠক মনেমনে উত্তর খুঁজে নেয়। এই দুনিয়ায় খনি শ্রমিকের চেয়ে মণিমুক্তোর কারিগর এবং তারও বেশি মণির মালিকের মূল্য বেশি। কবি আবুল হাসান নিজেও এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করেছেন। আজো আমরা দেখি এই সমাজের প্রান্তজন যারা তারা ঝিনুকের মতোই তাঁর শ্রমকে বালির মতো আঁকড়ে ধরে সমাজের জন্য ফসলের মুক্তাদানা উৎপাদন করে যায়। ওরা কথা বলে না, নিরবে সহে যায়। নিরবে ফসল ফলায়। কবি কি এখানে সেই বেদনার্ত নিরবতার কথাই লিখলেন? নাকি তাঁর গলায় আক্ষেপের সুর? আবুল হাসানকে পাঠ করতে গিয়ে আরো আরো প্রশ্ন, আরো আরো জীবনবোধ নাড়া দিয়ে যায় আবলীলায়।

আবুল হাসান তাঁর নিজের পরিচয় নিজেই দিয়ে গেছেন, নিজেকে নিয়ে লেখা ‘আবুল হাসান’ কবিতায়। সে কবিতায় তিনি নিজেকে একইসাথে পাথর, নদী, উপগ্রহ, রাজা, কান্না ভেজা চোখ, মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা— আবার তিনি নিজেই সংশয় প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘কি অর্থ বহন করে এইসব মিলিত অক্ষর?’ তিনি নিজে কি ছিলেন, তা নিজে কিভাবে বুঝেছেন সেটা তাঁর কবিতার অবাক পাঠক না জানলেও তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি পাঠককে কবি আবুল হাসান সম্পর্কে অনেক ধারণাই দেয়। কখনো কখনো মনে হয় তিনি স্বীকৃতির অভাবে কাতর, শুধু তাঁর নিজের নয় বটে। ‘আমি আমার আলো হবার স্বীকৃতি চাই, অন্ধকারের স্বীকৃতি চাই’- ‘স্বীকৃতি চাই’ কবিতায় তিনি এভাবেই আকুতি জানিয়েছেন। পাঠকের মনে তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কে বা কী কবির আলো কিংবা আঁধারের স্বীকৃতি দিচ্ছে না। হয়তো এই উত্তর ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না’- পঙ্ক্তির মধ্যে কবি নিজেই পেয়েছেন। কী এই জাতিসংঘ, কারা তা বানায়। সে প্রশ্ন কবিকে ভাবিয়েছে বটে। তাইতো কবির উষ্মা প্রকাশ আমরা দেখতে পাই তাঁর ‘অসভ্য দর্শন’ কবিতায়। এই কবিতায় তিনি রাজনীতিকে প্রশ্ন করেছেন চাঁছাছোলা ভাবেই। সেই প্রশ্ন ঠিক অনেকাংশেই। কিন্তু এই অসভ্য দর্শনের রাজনীতির পাল্টা রাজনীতির পথ কি কবি দেখিয়েছেন? কিংবা দেখিয়েছেন কি অন্য কোন পথ, যা শান্তির, শিল্পের? কবি আবুল হাসান শান্তি কিংবা শিল্পের পথ দেখান নাই হয়তো, তবে তিনি ‘স্বাতীর সাথে এক সকাল’ কবিতায় নিজেকে দাবি করেছেন, ‘আমি শান্তি আর শিল্পের মানুষ’। পাঠক কিন্তু আবার প্রশ্নের মধ্যে! কবি কোন শিল্পের মানুষ? ‘শিল্প এখন সুবিধাবাদ’ এটা তো তাঁরই কথা ‘প্রত্যাবর্তনের সময়’ কবিতায়। শিল্প যদি এখন সুবিধাবাদ হয় তা ভাঙতে হবে ধাক্কা মেরেই। জাতিসংঘ যদি নিতে না চায়, মৃত্যু দিয়েই ঘেরাও করতে হবে জাতিসংঘকে। ক্ষণজন্মা কবি আবুল হাসানের আক্ষেপ নিশ্চয় ঝিনুককে প্রতিরোধী বানাবে। খনিক শ্রমিকের আজ জরুরি মণিমুক্তার কারিগরের চেয়ে, উৎপাদক আজ জরুরি ভোক্তার চেয়ে, ঝিনুক আজ জরুরি মুক্তার চেয়ে। কারণ মা নিশ্চয় সন্তানের পরে নয়! আবুল হাসানের সাহিত্যকর্ম সেই জীবনবোধেরই শিক্ষা দিতে চেয়েছে। আবুল হাসান মানুষ, আমরাও মানুষ (অন্তত জৈবিকভাবে)।. ঠিক একই ভাবে সমাজের বিপুল অধিকাংশ ব্রাত্যজনও মানুষ। আর মানুষের মাতৃভাষা কি, তা আবুল হাসান তাঁর ‘মাতৃভাষা’ কবিতায় বলেছেন স্পষ্ট করেই-

‘শুধু আমি জানি
আমি একটি মানুষ,
আর পৃথিবীতে এখনও আমার মাতৃভাষা, ক্ষুধা!

র‌্যাঁবো : কবিতার ফিনিক্স পাখি // ড. সফিউদ্দিন আহমদ

র‌্যাঁবো ও র‌্যাঁবোর কাব্য-দর্শন আমি ভালো করে বুঝেছি, এমন বলার সাহস আমার নেই- তবে এতোটুকু বলতে পারি যে, মননে ও দর্শনে এবং কাব্য চর্চায় র‌্যাঁবো পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাঁদনের সীমাবদ্ধতা হতে মুক্ত হবার জন্য দুরন্ত ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছে। এমনকি তার নিজের কবিতার অধিনায়কত্বেও সে বশ মানেনি। শেষ জীবনে সার্ত্রে যেমন মার্কসিজমে আস্থা হারিয়ে বলেছিলেন- ‘এখানে স্বাধীনতা নেই- আমি চাই স্বেচ্ছা, একবারে স্বেচ্ছা ও স্বতঃস্ফূর্ততা’।

র‌্যাঁবো বারবারই বলেছে যে, পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের বাঁধনে বন্দি মানুষের জানাটা অতীব সীমিত এবং অজ্ঞ ও অন্ধের জানা। এই বৃত্ত থেকে একবার মুক্ত হতে পারলে তবেই মানুষ পঞ্চ-ইন্দ্রিয় বহির্ভূত অজানা, অচেনা, অসীম, অনন্ত আরো একটি জগৎকে জানতে পারবে এবং তখন সে নিজেই উপলব্ধি করবে যে, সে অসীম, অনন্ত ও প্রচণ্ড অলৌকিক সত্ত্বায় শক্তিমান আর তখনই সে ছুতে পারবে, অসীম-অনন্ত, বিশাল ও ব্যাপক অন্য আরো একটি জগৎ ও সত্ত্বাকে।

আমার ধারণা র‌্যাঁবো শুধু ফরাসি সাহিত্যে নয়- কাব্যে প্রতীকীয় নান্দনিকতায় র‌্যাঁবো সমগ্র বিশ্বেই কবিতার ফিনিক্স পাখি। সমকালে র‌্যাঁবো ছিল আলোড়িত, ধিকৃত, নিন্দিত ও সমাজচ্যুত কবি। শুধু তাই নয়, সেদিনকার নিন্দা ও কুৎসার পঙ্কে নিমজ্জিত র‌্যাঁবো আজ সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে নন্দিত, বন্দিত, প্রশংসার উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত এবং নব মূল্যায়নের মুখর আলোচনায় উচ্ছ্বসিত। সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে র্যাঁবোর তুলনা নেই- এবং র‌্যাঁবোই একমাত্র র‌্যাঁবোর তুলনা। র‌্যাঁবো আজ কবিতার দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত এবং কবিতার ফিনিক্স। আরো বলা যায়, সে আজ কবিতার এক আলোক দূত। র‌্যাঁবোর কাব্য সাধনা মাত্র চার বছর (১৬ থেকে ১৯ বছর)। সে সময়ের বিখ্যাত ও আলোচিত কবি হলেন প্রতীকীবাদের উদ্গাতা জাঁ মারিয়া এবং এছাড়াও বোদলেয়ার, মালার্মে, ভর্লেন ও লাফর্গ। মালার্মে র‌্যাঁবোর চেয়ে বারো বছরের এবং ভর্লেন দশ বছরের বড়ো আর লাফর্গ ছোট দু’বছরের।

সেদিনকার প্যারির বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিদ্বৎজন অবাক বিস্ময়ে চকিত হয়ে ভাবতো যে, এই প্রাপ্ত বয়স্কও কিশোর-ছোকরা মাত্র চার বছরে এমন কী লিখেছে যে, একে ও তার লেখা নিয়ে এতো তোলপাড় হতে পারে! বিস্ময়ের বিষয় এই অপ্রাপ্ত বয়সের কিশোর শুধু প্যারিতেই নয়- সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আজ শুধু বোদলেয়ার, মালার্মে, ভর্লেন ও লাফর্গ নয়- যে কোনো বড়ো কবির চেয়েও শতগুণ বেশি আলোচনা হচ্ছে র‌্যাঁবোকে নিয়ে এবং আমার তো ধারণা, কিশোর র‌্যাঁবোর জীবন জিজ্ঞাসা ও জীবন পিপাসা এবং আকাশস্পর্শী কাব্য চৈতন্য ছায়ালোকের ভেতর প্রচ্ছাদিত প্রতীকী প্রহেলিকার পর্দা কোনো দিনই কেউ উন্মোচন করতে পারবে না। যেমন পারে না মোনালিসার হাসির রহস্য উন্মোচন করতে।

র‌্যাঁবো যেমন তার আঙ্গুল দিয়ে প্রতীকীর সেঁতু বেয়ে Absolute কে (অসীম ও অনন্ত) ছুতে চেয়েছে, তেমনি তাবৎ বিশ্বেও নন্দনতত্ত্ববিদ ও গবেষক এবং আলোচকেরাও র‌্যাঁবোর প্রতীকীয়তার প্রহেলিকার সমাধান করতে চেয়েছেন কিন্তু বুঝতে পারছেন না, কী ছুতে চেয়েছে, কী ধরতে চেয়েছে র‌্যাঁবো। তীক্ষ্ণ টানা দু’টি জিজ্ঞাসু চোখ দিয়ে এবং তার হৃদয় ও মন দিয়ে ইন্দ্রিয়ের প্রাকার ভেঙে সমগ্র বিশ্বকে, মহাকাশকে, নক্ষত্রলোককে, অনন্ত অসীমকে ছেকে নিতে চেয়েছে র‌্যাঁবো। এ বিষয়ে র‌্যাঁবো আজ পর্যন্তও অজেয়, অনতিক্রম্য ও অধরা। আর এ নিয়ে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে কেউ কুল কিনারাও পাচ্ছে না। এ জন্যই র‌্যাঁবো ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের উর্ধ্বে। র্যাঁবো সমস্ত দুনিয়াটাকে ছেঁকে এনে নান্দনিক বিভার ঐশ্বর্যে কালোত্তীর্ণ, মনোত্তীর্ণ ও শিল্পোত্তীর্ণ আবেদনে কবিতাকে প্রতীকীয়তায় বাণীরূপ দিয়েছে। এজন্যই র্যাঁবো শুধু অনুভবে ও উপলব্ধিতে। অনেকেই হয়তো আঙ্গুল দিয়ে আকাশ ছোঁয়ার কল্পনা করতে পারে কিন্তু র্যাঁবোর প্রতীকীয়তা ও কবিতার বাণীকে ছোঁয়া কল্পনাও করতে পারে না।

অনেকেই হয়তো বলবে র্যাঁবো কী চায়? তবে র‌্যাঁবো নিজেই বলেছে- ‘আমি ভালোবাসি মরুভূমি, শুকিয়ে যাওয়া ফলের বাগিচা, বিবর্ণ ম্লান দোকান, ঠাণ্ডা হয়ে আসা পানীয়। নিজেকে টেনে নিয়ে যাবো পচা দুর্গন্ধের অলিগলি দিয়ে বন্ধ আঁখির কাছে, উৎসর্গ করবো সূর্যের চরণে, আগুনের যিনি দেবতা’। র‌্যাঁবোর কারো কাছে কোনো চাওয়া পাওয়ার আকাঙ্খা ছিল না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা-এমনও কিছু সে চায় নি। বলতে গেলে বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব, প্রেম-ভালোবাসা কোনো কিছুই তার প্রত্যাশা ছিল না। থাকা-খাওয়া পোশাক সব কিছুতেই ছিল নিস্পৃহ ও নির্লিপ্ত মানসিকতা। আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদা বা প্রতিষ্ঠার কোনো মোহও তার ছিল না।

কুলি, জেলে, মেথর-মুচি, চাষা-ভূষা বা পতিতজন কোনো কিছুতেই তার আপত্তি নেই। কিন্তু সে শুধু চেয়েছে তার লম্বা লক লকে আঙুল দিয়ে অসীম- অনন্তকে ছুঁতে। ধরতে চেয়েছে অধরাকে। তার যাত্রা ছিল অশ্রান্ত ও অনন্ত যাত্রা। হাজার বছর ধরে হেঁটেছে, বিরামহীন এ যাত্রা- এ পথ না ফুরোলেও তার আপত্তি নেই। বংশ গৌরব বা রক্তের অভিজাত্য নিয়েও তার কোনো গর্ব বা অহংকার ছিল না।

‘দূষিত রক্তে’ র্যাঁবো নিজেই বলেছে, পূর্বপুরুষ ছিল গল...। আমার পোশাক পরিচ্ছদেও একই বর্বরতা। ...তাদের কাছে থেকেই পেয়েছি পৌত্তলিকা, মহানকে অসম্মান করার মতো প্রবৃত্তির মত্ততা- শাসকই হোক, শ্রমিকই হোক, সবাই চাষা, সবাই নীচ, হীনকুলোদ্ভব। লাঙ্গল ধরে যে হাত তার থেকে কম নয় যে হাত লেখনী ছোঁয়। সকল কৌলিন্য বর্জিত কুল আমার, স্পষ্ট সে-কথা। পৌত্তালিক সেই রক্ত আবার সেই ফিরে এলো- আত্মা হাতের কাছে: কেন খ্রিস্ট আমায় টেনে তুলবেন না। দেবেন না আমার মনকে সেই নম্রতা, স্বাধীনতা, ধর্মশাস্ত্রেও যুগ চলে গেছে- হায় ধর্ম, হায়রে ধর্মশাস্ত্র! ভগবানের জন্য ক্ষুধিত আমার প্রতীক্ষা, সকল অনন্তকাল ধরে নীচকুলোদ্ভব আমি।

দাঁড়িয়ে আছি আমরিকার সমুদ্র তীরে। ....ফুটন্ত ধাতুর মতো তীব্র তিক্ত সুরাপান করবো। যেমন করতাম প্রিয় প্রপিতামহরা আগুনের ধারে বসে।

যখন আসাটা ফিরে আসবো লোহার মতো শরীর নিয়ে কৃষ্ণ চর্ম নিয়ে, চোখ জ্বলবে উন্মত্তের মতো। চোখ দেখেই লোকে বলবে বলিষ্ঠ হাত। ভয়ানক তৃষ্ণা পাবে আমার, হবো পাশবিক। আমি আজ অভিশপ্ত, স্বদেশকে ভয় করি বাঘের মতো। সবচেয়ে সুন্দর হলো যা, তা হচ্ছে মাতাল ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়া বিস্তীর্ণ বালুকা তটে। ধরি পথ নতুন করে, যে পথ আমার পাপের বঞ্চনায় ভারাতুর। বোঝবার বয়স হতেই সেই পাপের পীড়ন মুখর শিকড়গুলো বুক পর্যন্ত ঠেলে উঠেছে, উঠেই চলেছে আকাশের দিকে আমাকে ধাক্কা মেরে, উল্টে ফেলে, কখনো বা হিঁচড়ে হিঁচড়ে টেনে।

যখন খুব ছোটো, ভালো লাগতো এক দুর্ধর্ষ কয়েদীর কল্পনা- কারাগারের দ্বার যাকে উন্মুক্ত করে দিলো না কোনোদিন। ঘুরে বেড়িয়েছি সেই সব নাম না জানা সরাই আর পান্থশালায় তার ক্ষণ্ন অবস্থিতিতে একদিন যা ধন্য হয়েছে- তার দৃষ্টি দেখেছি আকাশের নীল প্রান্তরে, মুকুলিত শ্রমের বিস্তার, তার নিয়তির গন্ধ পেয়েছি শহরে-শহরে। তার যতো শক্তি ছিল, তা কোনো তপস্বীরও নেই, তার মতো সুবুদ্ধি কোনো ভ্রাম্যমাণের- সে, শুধু সে-ই একমাত্র তুলনা তার মহিমার, তার অবৈকল্যের। শীতের রাত্রির পথ, তার উপর দিয়ে গৃহহীন, বস্ত্রহীন, অন্নহীন করে স্বর আমার তুহিন শীতল হৃদয়কে আঁকড়ে ধরে চেচিয়ে ওঠে’।

র্যাঁবোর কবিতা পড়লেই বুঝা যায়- এ বড় সহজ বিষয় নয়। তার কবিতার ভাব বিষয় এবং অর্থ মনে হয় যেন আকাশেরও অনেক উপরে, নক্ষত্রলোক আর মিল্কওয়ে থেকে মিল্কওয়ে, এক কথায় মহাবৈশ্বিক চেতনায় প্রসারিত ও বিস্তারিত। তাই র‌্যাঁবোর কবিতার অর্থ খুঁজে বের করা সহজ বিষয় নয়।

বিস্ময়ের বিষয় মানুষ যদিও জেনেছে এবং দেখেছে মানবাত্মা ও মানবহৃদয় এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত এবং আরো অবলোকন করছে যে, বিদীর্ণ আত্মার এ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে মৃত্যুও প্রত্যক্ষতা। কিন্তু অস্তিত্ববাদী ও সৃজনশীল মানুষ এই ভয়াবহ অন্ধকার ও নানা যন্ত্রনা এবং হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত আত্মার আর্তনাদ শুনেই থেমে যাবে কেন? তাই নিজের অস্তিত্ব, সৃজনশীলতা, প্রাণ প্রবাহের গতি ও অস্তিত্বকে প্রমাণ করার জন্য এই অগ্নি গহ্বরেই নেমেছেন জাঁ রাসেন, বোদলেয়ার, মালার্মে ও ভর্লেন এবং কবিতার মহান দেবতা জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো।

তারা দেখেছেন আঘাতে আঘাতে জেগে ওঠবে জীবন, অরুনিমার আভা নিয়ে ফুটবে জীবনের ফুল। পাঁক, অন্ধকার ও বীভৎস কদর্যতায়ই ফুটবে সৌন্দর্যেও ঐশ্বর্য।

প্রতীক চর্চায় বোদলেয়ার, মালার্মে, ভর্লেন এদের মধ্যে র্যাঁবো ছিল তীক্ষ্ণ ও প্রখর। পথে পথে ঘুরেছে মুক্ত পথের পথিক হয়ে। যেমনি জীবনে, তেমনি সাহিত্যে, শিল্পে ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও মাতাল হয়ে ঘুরেছে র‌্যাঁবো। তার ‘মাতাল তরণী’ পড়লেই র‌্যাঁবোর এ মানসিকতার সাথে পরিচিত হওয়া যাবে।

র‌্যাঁবো ছিল সর্বক্ষেত্রেই বিদ্রোহী। বিশেষত প্রতীকের বিদ্রোহী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও সূক্ষ্ণ চিন্তার প্রয়াসী। র্যাঁবো খোলা রাস্তায় মহাঝড়ের ন্যায় ছুটাছুটি করে দেখেছে এ জগতকে।

র‌্যাঁবো সিম্বলিস্ট বা প্রতীকবাদী কবি। এই সিম্বল বা প্রতীকের কথা ভাবতে গেলেই আমাদের স্মরণে আসবে জাঁ রাসেন, বোদলেয়ার, মালার্মে ও ভর্লেন। এর আগে অবশ্যি আরো দু’জনের ক্ষীণ আভাস আসবে তারা হলেন সুলিপ্রুধোম ও মিস্ত্রাল। তবে আমাদের এর প্রথম পথিকৃৎ জাঁ মারিয়াকেও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতে হবে।

র‌্যাবোর জন্ম ফ্রান্সের এক প্রান্তিক শহরে। এই ছোট্ট শহরটির নাম শার্লভিল। জন্ম তারিখ ২০ অক্টোবর, ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর পুরো নাম জাঁ নিকোলাস আর্তু র‌্যাঁবো। বাবা ফ্রেডেরিক র‌্যাঁবো ছিলেন ফরাসি সেনাদলের ক্যাপ্টেন। বাবার সাথে মা’র সম্পর্ক ছিল খুবই অস্বস্তিকর। র‌্যাঁবোর বয়স তখন দু’বছর- মা ও বাবার মধ্যে চিরতরে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়- এবং মা’র কাছেই র‌্যাঁবো বড়ো হয়েছে। এক বিচিত্র জীবন র‌্যাঁবোর। ছোট্ট শহর শার্লভিলে তাদের বাড়ির নিচেই বিরাট এক লাইব্রেরি। দুনিয়ার যতোসব বই এখানে। দিনরাত এখানেই বসে বসে হরেক রকমের বই পড়তো র‌্যাঁবো। তার দুটি মহাদূরবীক্ষণের ন্যায় চোখ দিয়ে যা দেখতো তাই হৃদয়ে এবং মস্তিষ্কে ধারণ করতো। ধারণ করার ক্ষমতা ছিল আলৌকিক। বইয়ের পাতায় চোখ ফেললেই তার পড়া হয়ে যেতো- গেঁথে যেতো হৃদয় ও মস্তিষ্কে- ভুলতো না কখনো, দ্বিতীয়বার পড়ার প্রয়োজনও হতো না। র্যাঁবো ছিল এক আগ্রাসী পড়–য়া- যা পেতো গোগ্রাসে পড়তো আর এই পড়াকে আত্মীকরণ করে ফেলতো সহজে। বিস্ময়ের বিষয় স্কুলজীবনেই র্যাঁবো পড়েছে ফেনিমোর কুপার, গুস্তাব আইমোর, জুলেভার্নে, পড়েছেন অসংখ্য ভ্রমণ কাহিনী এবং পড়েছেন হেগেল ও সোয়েডনবর্গের দর্শন। সুলি প্রুধোম আর মিন্ত্রাল পড়েছে ফ্রান্সের লোককাহিনী এবং ইতিহাস ও সাহিত্য গভীর জীবন জিজ্ঞাসা ও আত্মজিজ্ঞাসা নিয়ে। প্রাচ্য বিশ্লেষণ করে ভারতীয় ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ, দর্শন, ধর্ম প্রচারক এবং দেব-দেবী ও দেবালয় সম্বন্ধে র্যাঁবো অনবহিত ছিল এমন বলা যায় না কারণ তার লেখাতেই এ সবের উল্লেখ আছে এবং পড়াশুনার ছাপও আছে। পড়াশুনায় এই গভীর আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা এবং জীবন জিজ্ঞাসা ও আত্মা জিজ্ঞাসার তাড়ানায়ই র‌্যাঁবো হয়ে ওঠেছে বিদ্রোহী, তার চোখে ধরা পড়েছে সমাজের ভণ্ডামি, অসংগতি ও ক্লোদ ক্লিন্নতা এবং মেকিত্ব। তাই র‌্যাঁবোর তীক্ষ্ম উচ্চারণ- ‘আমি যে দেখেছি সমুদ্র বহ্নিমান, ধোঁয়া ছুটেছে আকাশে, ডাইনে-বাঁয়ে রত্মাভান্ডারে জ্বলজ্বল করে কোটি কোটি বজ্রাগ্নিতে। সুরাপান নিষিদ্ধ আমার- মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্বও চলবে না। এমন কি স্ঙ্গীও হতে পারবে না কেউ।

পুরুত মশাই, শুরু মশাই, প্রভু মশাই, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আমায় কী ভুলই করলে তোমরা। এ দলের আমি নইগো, নইগো নই- কোনোদিন খ্রিস্টানও ছিলাম না আমি, থাকবোও না কোনোদিন- যে কুলে জন্ম আমার সে গান গেয়ে ওঠে যখনই দুঃখ পায়। আইন বুঝি না, নীতিজ্ঞান শূন্য আমি এক পশু। ভুল করেছো তোমরা।

প্রচলিত সমাজ ও দর্শন আইন ও শাসন ধর্মবোধ ও নীতিশান্ত্র এবং যৌনাচার- যাজকের ভণ্ডামি, প্রথাবদ্ধতার গোড়ামি এবং অন্ধবিশ্বাস ও উপদেশ এ সবের প্রতি ছিল তার বিবমিষা ও বিদ্রোহ। তাই র‌্যাঁবো নিজেই বলেছে। ‘নিজকে সইয়ে নিয়েছি সরল মতিভ্রমে- সত্যি দেখেছি আমি কারখানার জায়গায় মসজিদ, দেবদূতের পরিচালনায় যন্ত্র-সংগীতের বিদ্যালয়, আকাশপথে শকটের মিছিল, হৃদয়ের গভীরে বৈঠকখানা, কত যে দৈত্য, কতো রহস্য! কী এক প্রহসনের নাম চোখে বিভীষিকা ঘনিয়ে তুলেছে। এছাড়া শব্দের ছায়াবাজিতে বুঝিয়েছি যতো কূটতর্ক। অবশেষে আমার চেতনায় এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে খুঁজে পেলাম পবিত্রকে। তৃষ্ণায় ছটফট করেছি, আক্রান্ত হয়েছি প্রবল জ্বরে- ঈর্ষা করেছি পশুর সুখ, শুয়োপোকার নিরাপরাধ বিস্মৃতিলোক, গন্ধমূষিকের কৌমার্যময় তন্দ্রা। তিক্ততায় ছেয়ে গেলো আমার চরিত্র কয়েকটা গাঁথার মতো কবিতায় পৃথিবীকে বিদায় জানালাম’। এই বিদ্রোহের প্রতিম্বিকতায়ই সে হতে চেয়েছে প্রচলিত বৃত্ত ভাঙার দার্শনিক, তাকে হতে হবে দৈহিক যন্ত্রনার এক নরককুণ্ড, জীবনে থাকবে অভিশপ্ত আত্মার অগ্নিদহন আর এ সবকে প্রকাশ করার জন্য তাকে হতে হবে নান্দনিক ঐশ্বর্যের বিভায় উজ্জ্বল আলোকিত এক কবি। প্রারম্ভিক কৈশোরেই গুরুমশায়ের সাথে ক্লাসে লেগে যেত ঠুকাঠুকি। দুনিয়ার তাবৎ বই পড়ে তখনেই র্যাঁবো হয়ে ওঠেছিল এক চলন্ত অভিধান, গুরুমশায়ের ছাঁচে গড়া কথায় তার মন পুরতো না- তাই রক্ত চক্ষুর অগ্নিবাণ নিক্ষেপ হতো তার ওপর। পড়াশুনায় এই তীক্ষ্ণতার জন্যই শুধু গুরুমশায় নয় বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের চেয়েও এগিয়ে গিয়েছিল র‌্যাঁবো- এবং দেখলো সবই ফাঁকি, প্রহেলিকা, মিথ্যে ও ভণ্ডামি কৃত্রিমতার মুখোশ পরে সেজেছে জ্ঞানী, গুণী ও পণ্ডিত। এ সব দেখে শৈশবেই র‌্যাঁবো হয়ে ওঠলো প্রতিবাদী দার্শনিক, নন্দন-লোকের নতুন নান্দনিক, শিল্পকলার প্রচলিত বৃত্ত ভেঙে হাঁটলো খোলা উন্মুক্ত উদার প্রান্তরে। তছনছ করে দিয়েছে কাঠামোগত বিশেষ নান্দনিক জগতের প্রাচীর।

তাই র‌্যাঁবো বলেছে- ‘মন থেকে মানুষী আশার সমস্ত মুকুল নির্মূল করে দিলাম। হিংস্র পশুর মতো চতুর উল্লম্ফনে গলা টিপে ধরলাম প্রতিটি আনন্দের। ডাকলাম জল্লাদদের, মরবার আগে তাদের খাঁড়ার বাঁট কামড়ে ধরবো বলে- জড়ো করলাম জাঁতার কল, তারা যেন দলে পিষে গুড়িয়ে দিতে পারে আমায় বালুর সঙ্গে, রক্তের সঙ্গে। দুঃখই হলো ভগবান। কাদার মধ্যে বিছিয়ে দিলাম নিজেকে- পাপের হাওয়ায় হাওয়ায় শুকনো হলাম, পাগলামির পাকে- পাকে চক্কর খেলাম চমৎকার।

আর বসন্ত এনে দিলো আমার নির্বোধের বীভৎস এক হাসি’।

শার্লভিলে প্রথম জীবনে মায়ের কাছেই তার পাঠ। মা ছিলেন কাব্য পিপাসু। মায়ের কাছেই কাব্য চর্চার ও অনুপ্রেরণা। এ সময় তার জীবনে ঘটে গেছে একটি অনন্য ঘটনা। র্যাঁবো তখন মাত্র তেরো বছরের এক দুরন্ত কিশোর। ছোট্ট ও প্রান্তিক শহর শার্লভিতে ফ্রান্সের যুবরাজের আগমন উপলক্ষে তাকে অভিনন্দন জানালো লাতিন ভাষায় রচিত ষাট লাইনের এক কবিতায়। এই কবিতার মাধ্যমে অনেকের সাথে পরিচিত হলো র্যাঁবো এবং যুবরাজের সাথে নিজেও নন্দিত হলো এক প্রতিশ্রুতিবান কিশোর কবি হিসেবে। এবার র্যাঁবোর সামনে উন্মোচিত হলো আর এক নতুন জগৎ। আরো তিনটি কবিতা লিখে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তিনি প্রথম পুরস্কার পান। তিনি ১৮৭০ সালে La Revue Pour Tous পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটির রচনাকালে ১৮৬৯ সাল এবং এর শিরোনাম Les Etrennes des orphelins. র‌্যাবোর পড়াশুনা ছিল বহুমাত্রিক। ক্ষুধার্ত গরু, পাখি যেমন সামনে যা পায় তাই বাছ বিচার না করে শুধু গ্রাস করতে থাকে র‌্যাঁবোর অবস্থাও তাই- যে সব বই সামনে পেতো তাই পড়তো। তবে পড়ার কোনো বিরাম ছিল না কখনো।

দুঃখ-বেদনায় ভরা তিক্ত অভিজ্ঞতার এক বিচিত্র রক্তক্ষরিত জীবন ছিল র‌্যাঁবোর। রেললাইনে হেঁটে যাওয়া বা প্রথাবদ্ধ ছকে আটকানো জীবন তার ছিল না। এক দুরন্ত বাধা বন্ধনহারা নোঙর ছেড়া উন্মুক্ত জীবন আর উন্মুক্ত মাঠেই সে মুক্তি খুঁজেছে। তার স্কুলের শিক্ষকদের সাথেও মানসিকতায় জটিলতা দেখা দিয়েছিল বার বার। তাই র্যাঁবো বলেছে- ‘বহুদিনের গর্ব আমার, সম্ভব-অসম্ভব সমস্ত নিসর্গ শোভার ওপরই আছে আমার দখল আধুনিক কাব্য ও চিত্রকলার গগণস্পর্শী খ্যাতির আড়ালে জেনেছি তার চূড়ান্ত অসারতা। আমাকে টানে অর্থহীন ছবি, দরজার ওপর দিকটা, সাজ-সজ্জা, ক্রীড়কের পট, বিজ্ঞাপন ফলক, লোকশিল্পের রং চং সেকেলে সাহিত্য, গির্জার ল্যাটিন, বানান ভুলে ভর্তি আদিরসের বই, প্রাগৈতিহাসিক কাহিনী, রূপকথা, শৈশবের ছোট বই, পুরোনো গীতিনাট্য, সরল অস্থায়ী অমার্জিত ছন্দ।

এরই মধ্যে র্যাঁবো বেশ অনেকগুলো কবিতা লিখে ফেললো। প্যারি যাওয়া, আরো কবিতা রচনা ও প্রখ্যাত কবিদের সাথে দেখা করা এবং পরিচিত হওয়া এ ভাবনা যেন র‌্যাঁবোকে উন্মাদ করে তুলেছে-

এ সময়েই প্যারির বড়ো বড়ো কবির সাথে র্যাঁবো চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগও করলো এবং কয়েকটি কবিতাও পাঠিয়ে দিলো। কিন্তু কোথাও কোনো কবিতা প্রকাশিত হয়নি, তবে কেউ কেউ তাকে প্যারিস চলে আসার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। র‌্যাঁবো যে দুরন্ত এক কিশোর। দু’চোখে দুনিয়াটাকে ছেঁকে নেবার জন্যই যেন তার জন্ম। তাই এক জায়গায় অবস্থান আর ঘরে বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে যে মুক্তি চায় প্রথাবদ্ধ জীবন ও সংস্কৃতি হতে মুক্তি; প্রচলিত ধর্ম ও চিন্তাচেতনা হতে মুক্তি এবং সে যেন বলতে চায়-

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে,

আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে।...

বিশ্ববিধাতার যজ্ঞশালা, আত্মহোমের বহ্নিজ্বালা

জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি আশে।

এবার র‌্যাঁবোর জীবনে শুরু হলো আর এক নতুন পর্ব। ১৮৭০ সালের ২৯ আগস্ট ষোল বছরের দুরন্ত কিশোর র‌্যাঁবো বাড়ি থেকে পালিয়ে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিত্রশিল্প বিশেষ করে কবিতার স্বর্গ এবং স্বপ্ন রাজ্য প্যারিতে তার যাত্রা কিন্তু রেলে বিনা টিকিটে। শেষ পর্যন্ত তার হাজতবাস। বন্ধু শিক্ষক ও কবিতার প্রেরণাদাতা জর্জ ইজামবার্ডের সহায়তায় পেলো মুক্তি। মাত্র কিছুদিন বাড়িতে তবে কবিতা লেখার বিরাম নেই তার।

দুনিয়াটাকে দু’ চোখে ছেঁকে নেবার এক দুর্নিবার দুরন্ত কিশোর যে র‌্যাঁবো। এক জায়গায় অল্পক্ষণ থাকলেই তার চোখে সবই বিবর্ণ মনে হয়। পৃথিবীটা মনে হয় পাণ্ডুর ও ধূসর। তাই বাড়িতে বা নির্ধারিত স্থানে কে আটকে রাখবে তাকে! আবার বাড়ি থেকে পলায়ন। এবার তার গন্তব্য ব্রাঁসেলস। কিন্তু তার শিক্ষক বন্ধু ইজামবার্ড যেন বার বারই ত্রাণকর্তা হিসেবে ছায়ার মতো তার পেছনে তাকে অনুসরণ করে। তাই ব্রাসেলসে পালিয়েও তার মুক্তি নেই। সেখানে ইজামবার্ডের এক বন্ধু তার পরিচয় পেয়ে তাকে অনেক করে বুঝিয়ে পকেটে কিছু টাকা দিয়ে গাড়ির টিকিট কিনে সোজা বাড়ি পাঠিয়ে দিলো।

র্যাঁবোর মা ছেলের এতোসব কাণ্ড দেখে হতাশ ও হতবাক। শেষ পর্যন্ত ভর্তি করে দিলেন এক আবাসিক স্কুলে। কিন্তু স্কুলের সেই প্রথাবদ্ধ নিয়ম মাফিক বুলি এবং বন্দিঘর বা কারাগারস্বরূপ ক্লাস ভালো লাগবে কেন র‌্যাঁবোর! এরই মধ্যে সে অনেক পড়েছে, অনেক জেনেছে, উন্মুক্ত প্রান্তরের শিক্ষা লাভ করেছে এবং দার্শনিক হয়ে ওঠেছে। কিছুদিন বাড়িতে অবস্থান করছে র‌্যাঁবো ঠিকই কিন্তু এ যেন খাঁচায় বন্ধ গর্জন মুখর এক ক্রুদ্ধ সিংহ। পোষ মানবে কেন সে! এ সময়ের মানসিকতা পরে প্রকাশ পেয়েছে এভাবে- ‘আমি আবিষ্কার করতে চেয়েছি নতুন ফুল, নতুন তারা, নতুন আকাশ ও নতুন ভাষা। নিজেকে চিনেছি অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী বলে। এখন এতো কল্পনা এতো স্মৃতির কবর দাও, আর কী! আমার শিল্পের ও কথকতার খ্যাতির এমন একটা সুযোগ হারালাম।

আমি, যে আমি নিজেকে বলে এসেছি অবধূত বা দেবদূত সব রকম নীতি থেকে যে আমি পলাতক, সেই আমাকে কে আজ ফিরিয়ে দিলো মাটির হাতে, সঙ্গে দিলো এমন এক কর্তব্যের ভার যাকে খুঁজে ফিরতে হবে, এমন অকরুণ এক বাস্তব যাকে আঁকড়ে না ধরে উপায় নেই।

জয় অবশেষে আমাকে ধরা দিলো। দাঁতের কিড়মিড় শব্দ আগুনের হিস্ হিস ও বিষিয়ে ওঠা হা-হুতাস এতোক্ষণে নিজেদের সংযত করে আনল- নোংরা স্মৃতির ভিড় মুছে যায়। যা কিছু অনুতাপ ছিল অবশিষ্ট, যার কারণ আমার ঈর্ষা ভিখারীদের প্রতি আমার ঈর্ষা চোর-ডাকাত, মরণের বন্ধু গোষ্ঠী, পেছিয়ে পড়া সব রকম হতভাগ্যদের প্রতি তাও পাততাড়ি গুটোয়। হায়রে অভিশপ্ত জীবন। নিজের ওপর প্রতিহিংসা জাগে আজ। একবারে আধুনিক হওয়া চাই-

ভক্তি সংগীত আর নয়- একবার যখন চলেছো, গতিটি ছেড়ো না। কঠিন রাত। শুকিয়ে ওঠা রক্ত মুখখানা আমায় ধূমায়িত করে দেয়। পেছনে তো কিছুই দেখছি না এক ওই বীভৎস চারাগাছটি ছাড়া আমার মস্ত বড় একটা সান্তনা এই যে, আগাগোড়া মিথ্যা ভরা ওইসব পুরোনো প্রেমের কাহিনী শুনে আমি হো হো করে হেসে ওঠতে পারি, লজ্জায় কুকড়ে দিতে পারি ওই মিথ্যাভাষী দম্পতিদের। কেননা ওদের নরক আমি দেখে নিয়েছি’।

বার বার র্যাঁবোর জীবনের বাঁক পরিবর্তন হয়েছে। এবার স্কুল থেকে পালালো র্যাঁবো। সম্বল একমাত্র হাতঘড়ি বিক্রির সামান্য ক’টি টাকা। প্যারিতে পাড়ি জমালো। এরপর নেশা, যথেচ্ছাচার যৌন অনাচার পতিতালয়ে পতিতাদের সাথে বসবাস। এরই মধ্যে লিখছে আলৌকিক বাণীর মতো কবিতা। আর এসব কবিতায় বিষয়বস্তু আঙ্গিকে, প্রতীকে, রূপকে ও উপমায় এবং ভাবের গভীরতা ও অনুভূতির তীক্ষ্মতায় প্রচলিত কবিতার ধারাকে তছনছ করে উড়িয়ে দিয়েছে।

প্যারি থেকে বাড়ি ফিরে এলো র‌্যাঁবো- লেখা হয়ে গেলো মাতাল তরণী। এবারের সতেরো বছরের কিশোর র‌্যাঁবো যেন প্রাণোচ্ছল এক পরিণত যুবক। নিজের বয়সকে পরাজিত করে সে অনেক এগিয়ে গেছে, চোখে মুখে এমন কি সমস্ত দেহাবয়ে আলোকোজ্জ্বল কি যেন চাওয়া পাওয়ার চাহিদা।

এ সময় কবিতার শব্দ ভাব বিষয় ও বাণী বিন্যাস নিয়ে নতুন ভাবে যেন গবেষণা করছে র‌্যাঁবো। এরই মধ্যে তার লেখা দু’টি চিঠি সাহিত্যর ইতিহাসে হয়ে রইলো যুগোত্তীর্ণ ও মানোত্তীর্ণ। একটি তার বন্ধু শিক্ষক এবং পাবন জর্জ ইজামবার্ড অপরটি বন্ধু পল ডেমেনিকে। দু’টি চিঠিই পিঠা-পিঠি। ১৩ মে এবং ১৫ মে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে। এই চিঠি দুটিতে র‌্যাঁবো স্পষ্ট করে বলেছে যে, কবিতা সহজ ব্যাপার নয়, কবিতা আত্মার পীড়ন, হৃদয়ের যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণ এবং মানসিক যন্ত্রণার দহন, নিজের দেহ ও মনকে অশান্তির অনলে উত্তপ্ত কড়াইয়ে বলক দিতে হবে, প্রতি লোমকূপে ঝরাতে হবে রক্ত বিন্দু, প্রতি মুহূর্তে যৌন সম্ভোগকে সৃজনশীল ও নান্দনিক এবং কলামণ্ডিত করে নতুন উন্মত্ত আগ্রহ ও আনন্দ সৃষ্টি করতে হবে। কবিতা আসলে জ্যামিতিক বা গাণিতিক সূত্রের মতো কিছু নয়- এ হৃদয়, মন ও মস্তিষ্কের ওলট- পালট অবিন্যস্ত একটি প্রক্রিয়া মাত্র।

প্যারির কবিদের র‌্যাঁবো যেন চটিয়েই চলেছে। তার এক একটি উক্তি, কবিতার চরণ ও শব্দ যেন কবিদের কাছে আণবিক বিস্ফোরণ।

বহু বিচিত্র জীবন র‌্যাঁবোর। র‌্যাঁবোর সারাটা জীবনই বিদ্রোহ আর প্রতিবাদের উচ্চস্বরে উচ্চকিত। এবং এই প্রতিবাদ, বিদ্রোহ ও বিপ্লবের আগুন তার উষ্ণ রক্তস্রোতে ও প্রতি রক্ত কণিকায়। সময়টা প্যারি কমিউনের উত্তপ্তকাল। বিপ্লব, বিদ্রোহ আর আন্দোলনের আগুনে সমস্ত ফ্রান্স উত্তপ্ত। প্রান্তিক ছোট্ট শহর শার্লভিল থেকে সারা পথ পায়ে হেঁটে এসে এ আন্দোলনে একাত্ম হলো র‌্যাঁবো। দৈহিক অবয়বে র‌্যাঁবো সুদর্শন ও লতানো লম্বা। হাত-পা যেন আরো লম্বা। পরনে খাটো প্যান্ট, অবিন্যস্ত মাথার চুল মুখে ধূমায়িত জ্বলন্ত বিরাট চুরুট। সবাই বলতো র্যাঁবোর দুই চোখের আগুনে আর জ্বলন্ত লম্বা চুরুটের আগুন এক হয়ে যেতো।

এবার র‌্যাঁবোর জীবনে আরম্ভ হলো আর এক নতুন পর্ব। কবিতার ক্ষেত্রে ভর্লেন তখন তেমন পরিচিত না হলেও র্যাঁবোর কবিতার মাধ্যমেই তার নামের সাথে পরিচিত। এবং এ পরিচিতিতেই তার কাছে পাঠিয়ে দিলো কিছু কবিতা। র্যাঁবোর কবিতা আর চিঠি পেয়ে ভর্লেন আবেগ ও উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত। উত্তরে লিখলো ‘হে কবিতার আলোক দূত মহান বন্ধু আমার, তুমি কবিতার দেবদূত- যতো তাড়াতাড়ি পারো চলে এসো প্যারি এবং প্যারির কবিকূল অপেক্ষা করছে তোমার জন্য’। এবার কিশোর র‌্যাঁবোর মনে যেন ভরা নদীতে আবেগের জোয়ার। প্রাণের আবেগ যেন ‘রুধিয়া রাখিতে নারী।’ সে রাতেই তার চিরন্তন ও অমর সৃষ্টি ‘মাতাল তরণী’ এবং যেন বাতাসে পক্ষ বিস্তার করে ভোরেই তার যাত্রা প্যারিস।

ভর্লেন ভেবেছিলেন র‌্যাঁবো এক বিশাল ব্যক্তিত্ব ধরনের একটা কেউ হবেন। কিন্তু স্টেশনে গিয়ে এমন কাউকে পেলেন না। তিক্ত-বিরক্ত হতাশ মনে ফিরে এলো বাড়ি। ভর্লেন তখন ঘরজামাই। সুতরাং শ্বশুড় বাড়িতে ফিরে আসা ছাড়া তার আর উপায় কী! অবাক কাণ্ড ভর্লেন বাসায় ফিরে দেখলেন চোখে-মুখে বিদ্যুতের বহ্নিবাণ লিক লিকে সুদর্শন এক উদাসীন কিশোর পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে চুরুট টানছে। তাকে দেখে বিস্ময় বিমূঢ় হলেন ভর্লেন। র‌্যাঁবোর কী যেন এক আকর্ষণে সম্বিৎহারা হয়ে গেলেন ভর্লেন। বিস্ময়ে বিমোহিত হয়ে তার কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হলো ‘ও তুমি’! এই নোঙর ছেঁড়া, পথে ভাসা- ছিন্ন বস্ত্র ও ময়লা ভর্তি গা উদভ্রান্ত র‌্যাঁবোকে শুধু মাদাম ফ্লেয়ভিল কেন প্যারির কোনো কবি-সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবী কারো পছন্দ হয়নি। মাদাম ফ্লেয়ভিলতো তার উচ্ছন্ন আচরণে অতিষ্ঠ ও ত্রাহি ত্রাহি করছেন। এরই মধ্যে র‌্যাঁবো এমন কিছু অঘটন ঘটালো যা শুধু শিষ্টাচারবহির্ভূত নয়- নোঙরামির শেষ তলানি। যেমন :

১. খাবার টেবিল পা তুলে বসে পা নাচানো। ২. কারো অনুমতি না নিয়েই খাবার ঘরে উগ্র তামাকের পাইপ টেনে ধোঁয়ার গন্ধে ঘরময় ভরে তোলা ও সবার অস্বস্তি সৃষ্টি করা। ৩. সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় বাগানে শুয়ে থাকা এবং মাদাম ফ্লেয়ভিলের দৃষ্টিতে পড়া।

এমন অনাসৃষ্টির আপদকে কে সহ্য করবে! তাই এমন পরিবেশে শুধু র্যাঁবো কেন ভর্লেনেরই নীড় হারা অবস্থা। ভর্লেনের সাথে সমস্ত পরিবারের মনোমালিন্য ও অসহযোগ অবস্থা।

দুরন্ত কিশোর র‌্যাঁবোকে নিয়মের নিগড়ে আটকে রাখবে কে? তাড়া খাবার আগে সে নিজেই প্যারির রাস্তার পরিব্রাজক। হেঁটে আর অনাহারে শ্রান্ত ও ক্লান্ত অবসন্ন র্যাঁবো। র্যাঁবোর অভাবে ভর্লেনের দুরন্ত ব্যাকুলতা প্যারির রাস্তা হতে উদ্ধার করলো তাকে এবং কবি বন্ধুদের কাছে চাঁদা তুলে তার থাকা-খাওয়ার একটা ব্যবস্থাও করে দিলো ভর্লেন।

সমসাময়িক কবিদের কোনো পাত্তাই দিতো না র‌্যাঁবো। তবে বোদলেয়ারের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। বলতে গেলে র‌্যাঁবোর মাধ্যমেই বোদলেয়ার কবিতার মঞ্চে নতুন করে আবির্ভূত হলো এবং প্যারির কাব্যলোকে র‌্যাঁবোর ঘোষণা- ‘বোদলেয়ার হচ্ছে কবিদের রাজা ও কবিদের শিরোমণি।’

ভর্লেন ও র‌্যাঁবোর জীবনে শুরু হলো আবার এক নতুন নাটক। র‌্যাঁবোকে কিছু টাকাসহ চিঠি লিখলো ভর্লেন- কী করুণ মিনতি- 'আমি কারাগারে মরে যাচ্ছি' এই বন্দি জীবন আমার সহ্য হচ্ছে না- 'প্রিয় বন্ধু আমার, তোমার সঙ্গ ছাড়া আমি বাঁচবো না- আমাকে বাঁচাও। আমাকে রক্ষা করো।' আর এ সময়েরই সৃষ্টি 'নারকী রাত্রি' ও 'নারকী প্রেমিক'। এখানে কিছু অংশ উপস্থাপন করছি-

সুস্বাদু গরলের এক ঢোঁক গিলে ফেলেছি। যে-নির্দেশ এলো আমার কাছে তা ধন্য হোক, ধন্য হোক। সুস্বাদু জ্বালায় জ্বলে গেলাম। প্রচণ্ড গরমে আমার গা-হাত-পা বেঁকেচুরে শেষ হয়ে গেলো। বিকৃত হয়ে গেলাম। কে যেন আমায় ছুঁয়ে ফেলে দিলো। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে এলো চেঁচাতেও পারিনি। এই-ই নরক। এই যন্ত্রণার শেষ নেই! দ্যাখো, দ্যাখো, আগুন কি করে মাথা তুলেছে! আমাকে জ্বলতেই হবে- জ্বল তবে রাক্ষস।

একদিন না একদিন নরক আমায় টানতোই আমার ক্রোধের জন্য। আমার অহংকারের জন্য এবং সোহাগেরও এক নরক; কী বিচিত্র এক টান নরকের!

অবসন্ন হয়েই মরেছি কেবল। তাতেই তো করব- পালাই কৃমির উদ্দেশে সাংঘাতিকের চেয়েও সাংঘাতিক! শয়তান ভাঁড়, আমাকে চুর্ণ করতে চাও তোমার মোহিনী মন্ত্রে। আমি চাই, দাবি আমার, আমাকে দাও কাঁটা, একটি খোঁচা শুধু দাও আগুনের একটি বিন্দু।

আবার জীবনে ফিরে যাওয়া! চোখ বুলালো হাজার বিকৃতিতে! আর সেই গরল, সহস্রবার অভিশপ্ত সেই চুম্বন। আর সেই দুর্বলতা আমার। নিষ্ঠুর পৃথিবী। দয়া করো ঈশ্বর লুকিয়ে ফেলো আমায়! কী অশিষ্ট আচরণ আমার! লুকিয়ে আছি, আবার লুকিয়ে নেই। আগুনটা তার হতভাগ্য সহচরকে নিয়ে জ্বলে ওঠে বার বার।’ (নারকী রাত্রি)

‘আমি এখন পৃথিবীর অতল তলে- হায় বন্ধুরা! না, না, বন্ধুতো নয়- এই প্রলাপ, এই যন্ত্রণার তুলনা নেই কী মূঢ়তা! আমার যে বড়ো কষ্ট, আামি যে কাঁদছি- সত্যিই বড়ো কষ্ট আমার। যদিও সবই পেতে পারতাম- আমি জর্জর সেই গ্লানি ও ঘৃণায় যা যোগ্য চরম ঘৃণার্হ হৃদয়ের। ...সত্যিকারের জীবন সরে গেলো আমাদের কাছে থেকে। ও যখন যায় আমিও যাই- তা-ই তো দরকার। অথচ প্রায়ই ও আগুন হয়ে উঠতো আমার ওপর- এই আমি, আমার নিরুপায় আমার ওপর। একটা অসুর যেন, অসুরই বটে’। (নারকী প্রেমিক)

নিন্দে-কুৎসা নিয়ে প্যারির পরিবেশ অসহ্য মনে হয়েছিল- ভর্লেন আর র‌্যাবোর। তাই প্যারি ছেড়ে দু’মাস থাকলো বেলজিয়াম, এরপর সেখান থেকেই আবার দু’জনে শার্লভিতে র‌্যাঁবোদের খামার বাড়িতে কিছুদিন থেকে দু’জনে পাড়ি জমালো লন্ডনে। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে র‌্যাঁবো ফিরে গেলো শার্লভিতে মা’র কাছে। কিন্তু ভর্লেনকে ছেড়ে র‌্যাবোরও মন টিকছে না, তাই ফিরে এলো লন্ডনে ভর্লেনের কাছে। কিন্তু র‌্যাঁবোর পড়ার অভ্যেস কমে নি। বৃটিশ মিউজিয়ামে গিয়ে পড়ে ফেললো বেশ কিছু মূল্যবান বই, তবে এর মধ্যে কাব্য ও দর্শনের বই-ই বেশি। কিন্তু এর মধ্যে ভালো কবিতা রচনারও বিরতি নেই। এ সময়ই কবিতার সমস্ত ব্যাকরণ, নিয়ম রীতি ও আঙ্গিক প্রকারণ ভেঙে র্যাঁবোর অমর সৃষ্টি Une Saison EN Enfer (নরকে এক ঋতু)। যা র‌্যাঁবোর বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী মানসিকতার ফসল।

নারীর প্রতি মোহ কোনোদিনই ছিল না র‌্যাঁবোর। কিন্তু এরপরও ঘটলো এক অঘটন। লন্ডনে একটি মেয়ের প্রেমে পড়লো র‌্যাবো। এবার র‌্যাঁবো বুঝলো- নারীই জীবনের সবকিছু এবং নারীর ভালোবাসা ও নারী প্রেমই যথার্থ ভালোবাসা ও প্রেম। এবার ভর্লেনের প্রতি তার বিকর্ষণ। ভর্লেনের সাথে সংঘাত, জীবনের চরম বিপর্যয়, এতো-সবের পরে কবিতার জগৎ হতে চিরতরে বিদায় নিলো র‌্যাঁবো এবং এরপর আর কবিতা রচনা করেনি। সে ১৮৭৪ সনের কথা। র‌্যাঁবো নিজেই তার কুড়ি বছর পার হবার কথা বলেছে- ‘মানুষের শ্রম! সেই বিস্ফোরণেই আমার অতল কালো গহ্বর থেকে চমকে ওঠে।

মিথ্যে দেমাক তো নয়- চলো বিজ্ঞানের পথে, চলো সম্মুখ পথে’।... আর একটু জোরে পা ফেলো- তাড়াতাড়ি!- রাত্রির এই গভীরে শাশ্বতী লুকিয়ে রাখে ভাবীকালের পুরস্কার। আমাদের কপালে কি কিছু জুটবে না?

আমার জীবনে তো আর কিছু নেই, তাকে ব্যবহার করা হয়ে গেছে।...এ যাত্রা বেঁচে যাবো আমোদ করে। আসুরিক প্রেম আর আজগুবি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্বপ্নদেখে নালিশ করবো, তর্ক বাধাবো পৃথিবীর যতো বাহ্য সাদৃশ্য নিয়ে, তর্ক করবো ক্রীড়ক নিয়ে, ভিখারী, শিল্প-ডাকাত-পুরুত নিয়ে। ধূপের প্রবল গন্ধ এমন করে ফিরে এলো আমার হাসপাতালের শয্যায়- শহীদ যে, তার আত্মনিবেদনের পূতগন্ধী দ্বারিক সে।

ওইখানে চিনতে পারি আর শৈশবের কলুষিত শিক্ষাকে। এরপর! কুড়িটি বছর পেরিয়ে আসা। সকলেই আসে। না- আজ আমার বিদ্রোহ মৃত্যুর বিরুদ্ধে। গর্বের চোটে কাজটা খুবই হালকা মনে হচ্ছে। যে বঞ্চনা করে গেলাম পৃথিবীকে, তার যন্ত্রণা যেন ক্ষণস্থায়ী হয়। চরম মুহূর্তে, আক্রমণ চালাবো এদিক, ওদিক, ডাইনে-বায়ে...।

র্যাঁবোর কবিতার এসব উক্তি বিশ্লেষণ করলেই তার মানস চর্চা ও চর্যার শাশ্বত রূপ প্রতিভাত হবে আমাদের কাছে। র্যাঁবো আরো বলেছে- স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো কোনো কমনীয় যৌবন, শৌর্যপূর্ণ ও কল্পনায় কল্পিত, তা কি পাই নি অন্তত একবার- কতো বড়ো সেই ভাগ্য! এমন কী ভুল করেছি, কী সে- পাপ যার যোগ্যতায় অর্জন করলাম এতো বড়ো দৌর্বল্য তুমি তো ভান করো, বলতে চাও যে, জন্তুরাও দুঃখের দীর্ঘশ্বাস ফেলে, রোগীরা গুমরোয় হতাশ্বাসে, দুঃস্বপ্নে আকুল হয় মৃতরা- আমার পতন আর ঘুমের ইতিহাস বর্ণনা করো না একবার! আমি নিজেকে আর ভোলাতে চাই না বিবাগীর এই অবিরাম ‘পেটার’ আর ‘আভে মারিয়া’য়। আর বলতে পারি না আমি!

তুমি বিশ্বাস আজ, নরকের সঙ্গে সম্পর্ক আমার এইখানেই শেষ হলো না! সে নরক ছিল ভালো প্রাচীন তার দরজা খুলেছিলেন মানুষের মহান সন্তান।

একই মরুভূমিতে, একই রাত্রে, আমার ক্লান্ত চোখ বার বার জেগে ওঠে শুক্তিবর্ণ তারায় তারায়, জীবননাথ যদিও নিশ্চল, প্রজ্ঞার সেই তিন মূর্তি হৃদয়, আত্মা ও চেতনা। কবে যাবো আমরা ওই কঙ্কর বিছানো সৈকত ও শৈলশৃঙ্গের পাশ দিয়ে, নমস্কার করবো নতুন শ্রমের জন্মকে, নতুন প্রজ্ঞাকে- পালাবে বর্বর দস্যুদল, অন্ত হবে সব কুসংস্কারের, সে দিনই ধরনীতে হবে প্রথম খ্রিষ্টোৎসব। প্রথম পূজার দিন। আকাশ গেয়ে উঠলো পথিকের চলায় চলায়। বন্দি যারা তারা যেন জীবনকে আর অভিশাপ না দেয়।’

কাব্য জীবনে র‌্যাঁবো কী করেছে এটাই বড় কথা নয়- বরং কী করেনি তাই বড় বিষয়। জীবনকে দলিত-মথিত করেছে র্যাঁবো এবং দেবাসুরের সমুদ্র মন্থনের মতোই র্যাঁবো জীবন সমুদ্রকে মন্থন করে পৃথিবীকে ও কাব্যলোকে দিয়েছে অমৃত আর পান করেছে তরল-গরল এবং জীবনের শেষ তলানিটুকু। ভর্লেনের পিস্তলের গুলিতে আহত হবার পর আর কবিতা লিখেনি র‌্যাঁবো। বের হলো দেশ ভ্রমণে- প্রথমে লন্ডন ও জার্মান। ভালো করে রপ্ত করলো ইংরেজি ও জার্মান ভাষা। মাঝে কিছুদিন স্টুটগার্ডে টিউশনি করেছে। এরই মাঝে শিখে নিলো ইটালি, গ্রিক, স্প্যানিশ ও ডাচ ভাষা।

কি বিস্ময়ের বিষয়! জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভর্লেন স্টুটগার্ডে আবার দেখা করলো। র‌্যাঁবো কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দিলো মাতিলের কাছে। র‌্যাঁবো এখন এক অন্য মানুষ। বিচিত্র তার জীবন। ফোরম্যান, কফি কোম্পানির সুপারভাইজার, দীর্ঘ বিশ দিন ঘোড়ায় চেপে পৌঁছে গেলো হারারে।

সেনাবাহিনীতে যোগদানের একমাস পর পলায়ন। টানা দশ বছর কাটিয়েছে আফ্রিকায়- জড়িত হয়ে পড়েছে হাতীর দাঁত ও দাস ব্যবসা এবং বন্দুকের চোরাচালানে। এই চোরাচালানের সময় পায়ে গুলি খেয়ে দেশে ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হয়। একটি পা উরু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। ৩৭ বছর বয়সে স্বজনহারা হাসপাতালে বোন ইসাবেলের কোলে মাথা রেখে কবিতার দেবতা ও কবিতার আলোকদূত মৃত্যুবরণ করে। বিস্ময়ের বিষয় বোন ইসাবেলাও জানতো না যে, তার ভাই এতো বড়ো কবি ছিলেন।

নিয়তির পরিহাস, এতো কিছুর পরও ভর্লেন ভুলতে পারেনি র‌্যাঁবোকে। র‌্যাঁবোর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ভর্লেনও মৃত্যুবরণ করেন কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে র‌্যাঁবোর সমস্ত লেখা প্রকাশ করে যান।

র্যাঁবোর মৃত্যুর পর তার বিরোধীরাই প্রশংসা করে বলেছে- প্রতীক, চিত্রকল্প, রূপক এবং বিশেষ করে শব্দের যোজনা তথা বাণীবিন্যাসে র‌্যাঁবো এক অলৌকিক কবি। কবিতার প্রতীক ও শব্দ যোজনায় র‌্যাঁবোর তুলনা হয় না। তখন বলা হতো বাণীবিন্যাস তথা শব্দই কবিতার প্রাণ ও আত্মা। এ প্রসঙ্গে এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে হয়। মালার্মের এক চিত্রকর বন্ধু তাকে জানালো যে, তার ভেতর ভাবের প্রচণ্ড পীড়ন কিন্তু তিনি একটিও কবিতা লিখতে পারছেন না। উত্তরে মালার্মে জানালো- One does not write a poem with ideas. One writes it with good words. অর্থাৎ ভাবকে নান্দনিক ঐশ্বর্যে কবিতায় রূপদান করতে হলে সুন্দর শব্দ ও বাণী বিন্যাস চাই।

একজন শক্তিমান কবির হাতে এক একটি শব্দ হয়ে ওঠে ভয়াবহ ভূমিকম্পের মতো, বিসুভিয়াসের বিস্ফোরণের মতো, বজ্রের মতো ও এটমের মতো শক্তিশালী, প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবের মতো, সাগরের উত্তাল গর্জনের মতো, সূর্যের মতো তেজোদীপ্ত, আকাশের ও দিগন্তের মতো বিস্তার এবং পূর্ণিমার চাঁদের মতো আলোকোজ্জ্বল ও সাগরের মতো অতলান্ত গভীর। তাই আর্য ঋষিরা ঈশ্বরের কাছে শৈল্পিক শব্দ এবং ওজস্বী ও আবেদন ঋদ্ধ উচ্চারণ প্রার্থনা করতেন যেন ঈশ্বরের কাছে তার প্রার্থনার কণ্ঠস্বর পৌঁছে। র্যাঁবো তার কবিতায় এই প্রার্থিত শব্দেরই এক আলৌকিক কবি। র‌্যাঁবো জীবন্ত- র‌্যাঁবো প্রাণবন্ত। কবিতায় ও ভাবে, রূপক ও প্রতীকে, চিন্তা-চেতনা ও শব্দের অভিযোজনায় র‌্যাঁবোর বিদ্রোহ চলবেই। র্যাঁবোকে পড়ে, র‌্যাঁবোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে, র‌্যাঁবোকে বুঝিয়ে কেউ কখনো শেষ করতে পারবে না। তার সৃষ্টি অল্প- কিন্তু তাই পারমাণবিক শক্তিতে ভরপুর- ভেতরে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। সৌরচুল্লির কেন্দ্রীয় তাপের মতো র‌্যাঁবোর কাব্যের মহৎ ভাব ও উত্তাপ কালান্তরে উৎসারিত হবে। র‌্যাঁবোর কবিতা ও ভাব কখনো জরাগ্রস্ত হবে না। এ যেন সে পৌরাণিক ফিনিক্স। বারবারই জরাকে পরিহার করে নব কলেবরে পক্ষ বিস্তার করবে ইকারোসের উজ্জ্বল আকাশে। কোনো জরা কোনো জীর্ণতা র‌্যাঁবোকে আচ্ছন্ন করতে পারবে না। ফ্লোরেন্সের রাজপথে প্রৌঢ় দান্তেকে হেঁটে যেতে দেখে নাকি যুবতীরা বলতো নরকের পথে হেঁটে হেঁটে তাঁর দাঁড়ি পুড়ে গেছে। কিন্তু নরকের আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটেছে র‌্যাঁবো- মাঝে মাঝে শুধু আগুনের ওপর দিয়েই হাঁটেনি আগুনের ভেতর ডুবে গেছে- নরকের গলিত লাভা স্রোতের প্রলেপ আচ্ছাদিত হয়েছে সমস্ত গা কিন্তু র‌্যাবোর গায়ে একটুও আঁচ লাগেনি- তার গায়ের একটি লোমও পুড়েনি। র‌্যাঁবো বলতো, ‘আমার কবিতা কোন তরুণী বা যুবতীর জন্য নয়।’ র‌্যাঁবো কবিতা অভিঘাত করেছে শুধু ফ্রান্সে নয় জার্মান-গ্রিকে, স্পেনে এমনকি আমাদের বাংলাদেশেও। র‌্যাবোকে স্বাগত জানিয়ে নন্দিত করেছেন ভিক্টর হুগো, পাবলো নেরুদা, ব্রেশট। নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে র‌্যাঁবোর উচ্চারণে তারা উচ্ছ্বসিত হয়েছেন।

আলবেয়ার কামুর মতে, কবিদের মধ্যে র‌্যাঁবো সেরা এবং বৃত্ত ভাঙার এক বিদ্রোহী কবি। আদ্রে ব্রেতোঁস বলেছেন র‌্যাঁবো কবিতার ‘এক কিশোর দেবতা’ আর রেঁনের ধারণায় র‌্যাঁবো কুমারী সভ্যতার প্রথম কবি। র‌্যাঁবোর পরে যারা নতুন কবি, বৃত্ত ভাঙার কবি, তাদের এমন একজনও নেই যাদের উপর র‌্যাঁবোর প্রভাব প্রতিফলিত হয়নি। ফ্রান্সের চরম ক্রান্তিলগ্নে অস্থিরতা ও উত্তেজনায় র‌্যাঁবো অসীম এবং অনন্তের উদ্ভাসে অনন্ত সত্তায় আলোকিত জীবনের সন্ধান করেছে। সমস্ত গ্লানি ও কলঙ্কের ওপর গড়তে চেয়েছে অনন্ত সত্তা।

আমাদের এখানে অবশ্যি স্মরণে রাখতে হবে যে, র‌্যাঁবোর বিশ বছরে বয়সের পরের যে জীবন এ জীবন কবি র‌্যাঁবো বা সাহিত্যিক র‌্যাঁবোর জীবন নয়। আর এ জন্যই বিশ বছর পূর্তির প্রাক্কালে র‌্যাঁবোর বিদ্রোহের আর এক বিস্ফোরিত জীবনের প্রচণ্ড প্রজ্বলন। আর এ জন্যই বিশ বছরপূর্তির প্রাক্কালে র‌্যাঁবো তার নিজের কিছু মহৎ রচনার পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে। শুরু হয় তার অন্য এক জীবন। যে জীবন নিজের ওপর নিজের অত্যাচারের। সুতরাং র‌্যাঁবোর কাব্যজীবন ও সাহিত্যিক জীবনের সাথে বিশোত্তীর্ণ এ জীবনের কোনো সম্পর্কই নেই। গবেষক সাহিত্যিক ও কবিতা প্রেমিক এবং এমন কি কবিরাও আমার সাথে একমত হবেন না জানি; কিন্তু আমার ধারণা র‌্যাঁবোর কবিতার ভাব ও ভাষা, রূপক ও প্রতীক এবং চিত্রকল্প ও উপমা এতোই গভীর ও সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন যে, মনে হবে দূর অসীম অনন্ত ওই আকাশের নক্ষত্রলোক থেকে যেন ঠিকরে ঠিকরে পড়ে আসা আলো। অন্য কথায় বলা যায় র‌্যাঁবোর কবিতা অসীম অনন্ত আকাশের যেন মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথ- যেখানে কোটি কোটি নক্ষত্র আলো দিচ্ছে কিন্তু সবটুকু বুঝে যাচ্ছে না- দেখাও যাচ্ছে না অথচ সেখানে আলোর উৎসব ও ঝর্ণাধারা বয়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে র‌্যাঁবোর কবিতা কিছুই অনুভব ও উপলব্ধি করা যাবে না, মনে হবে ভেতরে সারবস্তা বলতে কিছুই নেই, যেন কেবলই স্বপন করিছে বপন পবনে। আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সবগুলো দ্বারা উম্মুখ রেখে বার বার র‌্যাঁবোর কবিতা পড়লেই তবেই দেখা যাবে তার কবিতা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অসীম অনন্ত আকাশের ওই নক্ষত্রলোকে মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথে, সাগরের অতল গহন গভীরে, মাটির প্রতিটি কণার অনুযঙ্গে এবং সবচেয়ে দুর্গম মানুষের মনের অতলান্তে। এ ছাড়া আরো বোঝা যাবে র‌্যাঁবোর কবিতার ব্যাপকতা, বিশালতা ও বিস্তৃতি। আমরা তখন আরো উপলব্ধি করবো যে, র‌্যাঁবো সত্যিই কবিতার দেবতা ও কবিতার ফিনিক্স। (সমাপ্ত)

লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।